add

ঢাকা, শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ৩০ চৈত্র ১৪৩০

নাজাতের বিজোড় রাতগুলোতে ৪ আমল ছাড়বেন না

সরোবর ডেস্ক 

 প্রকাশিত: এপ্রিল ০১, ২০২৪, ০৪:১৪ দুপুর  

পবিত্র রমজানকে বলা হয় সাইয়িদুশ শুহুর বা সকল মাসের সেরা মাস। আর রমজানের সবচেয়ে মর্যাদার রাত হলো লাইলাতুল কদর বা ‘শবে কদর’। এ রাতের চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ কোনো রাত বা দিন নেই। এটি উম্মতে মুহাম্মদির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে তোহফাস্বরূপ। কোরআনুল কারিম নাজিল হয় এ রাতেই। পবিত্র কোরআনে এই রাতের নামে অর্থাৎ ‘কদর’ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সুরাও রয়েছে।

এ সুরায় বলা হয়েছে—লাইলাতুল কদরে কোরআন নাজিল হয়েছে, এটি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম এবং এ রাতে ফেরেশতারা আল্লাহর নির্দেশে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। এ রাতের ফজর পর্যন্ত প্রশান্তি বর্ষিত হয়।’ (দেখুন সুরা কদর: ১-৫)

‘হাজার মাসের চেয়ে উত্তম’ মানে একহাজার মাসের চেয়ে উত্তম-এমন নয়, বরং অনেক বেশি বোঝাতেও হাজার শব্দটা ব্যবহৃত হয়। তারপরও আমরা যদি এখানে এক হাজার মাসই ধরি, এর সময় দাঁড়ায় ৮৩ বছর ৪ মাস। তার মানে ৮৩ বছর ৪ মাস ইবাদত করার যে ফজিলত, তা শবে কদরের এক রাতের ইবাদতেই পাওয়া সম্ভব।

তাই রমজানের শেষ দশকে ইবাদতে লেগে পড়া উচিত। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রমজানের শেষ ১০ রাত শুরু হলে নবী (স.) কোমর বেঁধে নামতেন। তিনি নিজে রাত জেগে ইবাদত করতেন এবং তার পরিবারের সবাইকে (ইবাদতের জন্য) জাগিয়ে দিতেন।’ (সহিহ বুখারি: ২০২৪; সহিহ মুসলিম: ১১৭৪)

অন্তত বিজোড় রাতগুলোতে বেশি বেশি আমল করা উচিত। কেননা হাদিসে রমজানের প্রতিটি বিজোড় রাতে শবে কদর অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে। হাদিস শরিফে এসেছে , ‘তোমরা শেষ দশকের বিজোড় রাতে শবেকদর তালাশ কর।’ (বুখারি: ২০১৭)

আজ ২১ রমজান। নাজাতের প্রথম রমজান শুরু। যারা ইতেকাফে বসেছেন আর যারা ইতেকাফ করছেন না, তারা যত বেশি সম্ভব ইবাদত বন্দেগিতে মগ্ন থাকবেন। অন্তত ৪টি আমল বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেগুলো মিস করা কোনোভাবেই উচিত হবে না। আমলগুলো হলো—

১. মাগরিব, এশা ও ফজর নামাজ জামাতে আদায় করা
এই রাতে মাগরিব, এশা ও ফজর নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা উচিত। তাহলে হাদিস অনুযায়ী শবে কদরের ফজিলত লাভ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি এশা ও ফজর জামাতের সঙ্গে পড়ে, সে যেন সারা রাত দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ে।’ (মুসলিম: ৬৫৬)

২. তারাবি-তাহাজ্জুদ ইখলাসের সঙ্গে আদায় করা
প্রত্যেক বিজোড় রাতে (২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯তম রাতে) ২০ রাকাত তারাবি পড়বেন। যতটা সম্ভব ইখলাসের সঙ্গে, খুশু-খুজুসহকারে পড়বেন। আর তাহাজ্জুদের গুরুত্ব ও ফজিলত সবসময় বেশি। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য তাহাজ্জুদের বিকল্প নেই। শেষ রাতে মানুষ যখন গভীর ঘুমে মগ্ন, তখন  প্রভুর ভয় ও ভালোবাসায় যারা নিদ্রা ত্যাগ করেন, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা শয্যা ত্যাগ করে তাদের প্রতিপালককে ডাকে আশায় ও আশঙ্কায়। আর আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে’ (সুরা সাজদা: ১৬)। মহানবী (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘রমজানের পর সর্বশ্রেষ্ঠ রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা। আর ফরজ নামাজের পর সর্বশ্রেষ্ঠ নামাজ হলো রাতের (তাহাজ্জুদের) নামাজ।’ (মুসলিম: ১১৬৩)

৩. শবে কদরের দোয়া পড়া
আয়েশা (রা.) রাসুলুল্লাহ (স.)-কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি যদি জানতে পারি লাইলাতুল কদর কোনটি, তাহলে আমি সে রাতে কী বলব? তিনি বলেন, ‘তুমি বলো, ﺍﻟﻠَّﻬُﻢَّ ﺇِﻧَّﻚَ ﻋَﻔُﻮٌّ ﺗُﺤِﺐُّ ﺍﻟْﻌَﻔْﻮَ ﻓَﺎﻋْﻒُ ﻋَﻨِّﻲ উচ্চারণ: ‘আল্লা-হুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নী’ (আরবি উচ্চারণ দেখে পড়বেন)। অর্থ: ‘হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল। ক্ষমা করাটা আপনার পছন্দ। অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন।’ (সুনানে তিরমিজি: ৩৫১৩)।

সুতরাং সারাদিন-রাত বেশি বেশি এই দোয়া করবেন। এই দোয়াটি হাঁটা-চলা-শোয়া অবস্থায় করা যায়। শেষ দশকে বেশি বেশি পড়া উচিত।

৪. পরিচ্ছন্ন হওয়া
লাইলাতুল কদরের বরকত লাভের প্রধান শর্ত হলো ভেতর ও বাইরের পবিত্রতা লাভ এবং একনিষ্ঠ হয়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হওয়া। আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলি বলেন—‘উত্তম হলো- যে রাতে কদর অনুসন্ধান করা হবে, তাতে পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, গোসল-সুগন্ধি-উত্তম কাপড়ের মাধ্যমে সৌন্দর্যবর্ধন করা। আর বাহ্যিক সৌন্দর্য সৌন্দর্যের জন্য যথেষ্ট নয়, যদি না মানুষের ভেতরটা সুন্দর হয়। মানুষের ভেতর সুন্দর হয় তওবা ও আল্লাহমুখী হওয়ার মাধ্যমে।’ (লাতায়িফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা-১৮৯)

উল্লেখিত আমলগুলোর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। প্রত্যেকটি আমল এমনভাবে করবেন, যেন আজকেই নিশ্চিত শবে কদর। এ বিষয়ে মনে এমন কোনো সন্দেহ না রেখেই ইবাদত করবেন। তবে এগুলোই শবে কদরের একমাত্র আমল নয়। দান-সদকা করা, বেহুদা কথা-কাজ থেকে দূরে থাকা, যত সম্ভব জিকিরে মশগুল থাকা—প্রত্যেকটি নেক আমলের বিপুল সওয়াব অর্জন করার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে এই পবিত্র রাতে।

উল্লেখ্য, শবে কদরের নামে কোনো বিদআতে জড়াবেন না। ইসলামি শরিয়তে লাইলাতুল কদরের বিশেষ কোনো নামাজ কিংবা পদ্ধতি নেই। কদরের নামাজে বিশেষ সুরা পড়তে হবে-এমন কথা লোকমুখে প্রচলিত আছে। আসলে এর কোনো ভিত্তি ইসলামে নেই। নামাজের আলাদা কোনো দোয়া বা মোনাজাতও নেই। অনেকে তিন বার করে সুরা পড়েন। এসব বিশুদ্ধ পদ্ধতি নয়, জরুরিও নয়। নিজের মতো করে দোয়া করবেন, নামাজে সুরা কেরাত পড়বেন অন্য সময়ের নফল নামাজের মতো।

আল্লাহ তাআলা আমাদের লাইলাতুল কদর নসিব করুন। সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।

দৈনিক সরোবর/বি কে