add

ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০২৪, ২ আষাঢ় ১৪৩১

সরকার করহার বৃদ্ধি করছে

বাজেটে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: মে ১৪, ২০২৪, ০৭:১৯ বিকাল  

সরকার আয় বৃদ্ধি করতে নজর দিয়েছে ভ্যাট, আমদানি শুল্ক, সম্পূরক ও সুনির্দিষ্ট শুল্কের ওপর। ক্ষেত্র বিশেষ নতুন ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। উৎপাদন ও আমদানি পর্যায়ে সর্বনিম্ন ২ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট, আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হবে। এমনিতেই শুল্ক-কর আদায়ে মরিয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একদিকে সরকারের বাড়তি ব্যয়ে অর্থ জোগান দেয়ার চাপ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত পূরণ করার বাধ্যবাধকতা। সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেটে করছাড়ের চেয়ে কর বা রাজস্ব আদায়ের উদ্যোগই বেশি থাকছে। তাই ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে সব রকম পণ্য ও সেবায় অভিন্ন হারে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) নির্ধারণ করবে এনবিআর। ফলে উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ভ্যাটের হার বৃদ্ধি পাবে ১৫ শতাংশ।

জানা গেছে, এবারের বাজেটে সরকারের ব্যয়ের ধরন মোটামুটি গতানুগতিক থাকছে। তবে রাজস্ব থেকে আয় বৃদ্ধি করতে ভ্যাট ও করের ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সরকারের ব্যয়ের ধরন মোটামুটি গতানুগতিক থাকলেও আসন্ন নতুন অর্থবছরের বাজেটে এবার আয়ের সমীকরণ পাল্টে যাচ্ছে। রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করতে অনেক ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে ভ্যাট ও করের হিসাবে। সহজ করে বললে, রাজস্ব আয়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আগামী বাজেটে করহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। মোটা দাগে কর ও ভ্যাটের বাড়তি চাপে বাজেট জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের ভ্যাট (ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স) বা মূসক (মূল্য সংযোজন কর) আদায়ের ছক কষা হয়েছে। এর পরিমাণ এনবিআরের মোট লক্ষ্যমাত্রার ৩৫ শতাংশ অর্থাৎ ১ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এতে ঋণদানকারী সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলেরও (আইএমএফ) উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে সুপারিশ করেছে। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন, বৈশ্বিক মন্দা ও ডলার সংকটের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। ভ্যাটের ভার বাড়ানো হলে অনেক খাতে খরচ বাড়বে। এতে সাধারণ আয়ের বেশিরভাগ মানুষের ভোগান্তিও বাড়বে।

এনবিআর সূত্রে বলছে, অর্থবছরের ২০২৪-২৫ বাজেটে বাড়তি ১০ হাজার ২০০ কোটি টাকা আদায় করার পরিকল্পনা করেছে এনবিআরের ভ্যাট বিভাগ। এর মধ্যে ১ হাজার কোটি টাকা আদায় করা হবে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইসের (ইএফডি) মাধ্যমে। এছাড়া শুল্ক বিভাগ বাড়তি আদায় করবে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিছু কিছু পণ্যের শুল্ক অব্যাহতি তুলে দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আসন্ন অর্থবছরে নির্ধারিত পরিমাণে রাজস্ব আহরণে আইএমএফের চাপ রয়েছে। যার কারণে বেশ কিছু খাতে রাজস্ব অব্যাহতি তুলে দেয়া হতে পারে। কিছু কিছু ভ্যাট ও ট্যাক্সের হার পুনঃনির্ধারণ করা হতে পারে। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে কর অব্যাহতি তুলে দেয়া হতে পারে।

রাজস্ব আহরণে মরিয়া এনবিআর। পদে পদে কর ও ভ্যাটের জাল

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চলতি অর্থবছরে দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। এবার বাজেটের আগে অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি ঋণের ঝুঁঁকি বাড়ছে। প্রবৃদ্ধির ধারা কমার কারণে কম কর সংগ্রহের মতো বিষয়গুলো মূল সংকট হিসেবে দেখছেন তারা। প্রবৃদ্ধির ধারা শ্লথ হওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে যে শুল্ক ছাড় পাওয়া যেত; সেটা এবারের বাজেট থেকে তুলে নেয়া হবে। আবার আইএমএফের শর্তের কারণে অনেকে যে প্রণোদনা পাচ্ছিলেন, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে তুলে নেবে। এতে চাপ আরও বাড়বে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। 

এ বিষয়ে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদের মতে, রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে  বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে নতুন করদাতা খুঁজতে হবে। তবে করযোগ্য আয় নেই এমন ব্যক্তির কাছ থেকে আয়কর আদায় করা অন্যায় হবে। তিনি আরও বলেন, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কর আদায় ব্যবস্থা নিশ্চিত করলে বাড়তি কর আদায় করা সম্ভব হবে। কর সংগ্রহ পদ্ধতি আরও সহজ ও গ্রাহকবান্ধব করতে হবে। কর ফাঁকি রোধ করতে হবে। আর জরুরি খাত ছাড়া কর অব্যাহতি তুলে দিতে হবে। 

এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, রাজস্বের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে; রাজস্ব খাতে বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। তবে কোনো খাতে যেন অযৌক্তিকভাবে কর আরোপ করা না হয়; সে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। জনগণকে চাপে না ফেলে রাজস্ব বাড়ানোর কৌশল গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসন্ন বাজেটে ধনীদের ছাড় দিয়ে নিম্নআয়ের মানুষকে করজালের মধ্যে আনার ছক থাকছে বাজেটে। কারণ শূন্য আয় (করযোগ্য সীমার নিচে বার্ষিক আয়) দেখিয়ে আগে রিটার্ন জমা দেয়া গেলেও আগামী দিনে স্লিপ (প্রাপ্তি স্বীকারপত্র) পেতে ন্যূনতম দুই হাজার টাকা; আর সময় মতো না দিলে দ্বিগুণ জরিমানা গুণতে হবে। রিটার্ন জমার স্লিপ না নিলে সঞ্চয়পত্র কেনা এবং ব্যাংক ঋণ নেয়া যাবে না। ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস নবায়ন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, বাড়ির নক্সা অনুমোদনসহ সব মিলিয়ে সরকারি-বেসরকারি ৪৪ ধরনের সেবা পাওয়া যাবে না।

বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে বার্ষিক করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ টাকা থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকায় উন্নীত করার ঘোষণাও থাকতে পারে। আগামী বাজেটে এনবিআর বিভিন্ন খাতে উৎসে কর বসিয়ে কর আদায়ে বেশি মনোযোগী। জমি-ফ্ল্যাট কেনায় কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল করা হচ্ছে। উল্টো সকল নিবন্ধন ফি বাড়তে পারে। ভ্রমণ কর বাড়ানোর প্রস্তাব পাস হলে বিদেশ ভ্রমণে বাজেট বাড়াতে হবে। 

এই বিষয়ে সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান এ নিয়ে বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপ আছে। তাই করমুক্ত আয়সীমা কিছুটা বাড়িয়ে স্বস্তি দেয়া হবে। উন্নয়ন কর্মকান্ড বন্ধ করা যাবে না- অর্থ লাগবে। তাই জনগণের ওপর করের চাপ না বাড়িয়ে করের জাল বিস্তৃত করা হবে। সঠিকভাবে কর জাল বিস্তৃত করতে পারলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জিত হবে। আমাদের এখন বাড়তি রাজস্ব লাগবে। 

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ধনী-দরিদ্র সবাইকে একই দামে পণ্য কিনতে হয়। তাই ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে। তিনি বলেন, ভ্যাটে নির্ভরতায় রাজস্ব আদায়ের কৌশল নির্ধারণ করা হলে ভ্যাটে ঘাটতি থাকলে মোট রাজস্ব আদায়েও তার প্রভাব পড়বে। গত কয়েক বছর ধরেই এনবিআর ঘাটতিতে আছে। বৈশি^ক মন্দা ও ডলার সংকটের কারণে অর্থনীতিতে সুবাতাস নেই। এনবিআর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলে সমগ্র অর্থনীতি চাপে পড়বে। অর্থনীতির আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হবে।

দৈনিক সরোবর/কেএমএএ