add

ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

এলপিজির ব্যবহার

বিপদ বাড়ছে সিলিন্ডার গ্যাসে

এসএম শামসুজ্জোহা 

 প্রকাশিত: এপ্রিল ০৬, ২০২৪, ০৬:৫০ বিকাল  

বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন ভবন ও স্থাপনায় বিপজ্জনকভাবে ব্যবহার হচ্ছে তরলকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার। এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে বাড়ছে দুর্ঘটনা। এতে প্রাণহানিসহ ক্ষতি হচ্ছে সম্পদের। তদারকি ও জনসচেতনতার অভাবে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে প্রাণহানি। 

গত আড়াই মাসে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে আগুন লেগে মৃত্যু হয়েছে অর্ধশতাধিক মানুষের। কোনোভাবেই নিয়মের মধ্যে আসছে না গ্রাহক ও বিক্রেতা। এলপি গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের একটি বিধিমালা থাকলেও তা মেনে কেউ বাসাবাড়িতে সিলিন্ডার ব্যবহার করছে না।

জানা গেছে, দেশে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁঁকি বাড়াচ্ছে মানহীন ও ঝুঁঁকিপূর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার। বর্তমানে পরিবহন ও রান্নার কাজে সিলিন্ডারের ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও সিলিন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি বাড়ছে না। ফলে দুর্ঘটনায় সম্পদ ও প্রাণহানির ঝুঁঁকিও বাড়ছে। পরিবহনে এখন সিএনজি (সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস) অনেক জনপ্রিয়। এর পাশাপাশি ব্যাপক বাড়ছে রান্নার কাজ ও পরিবহনে এলপিজি (তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সিলিন্ডারের ব্যবহার। তাতে মানহীন সিলিন্ডারে গাড়িতে ও রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাস থেকে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।

তথ্য মতে, দেশে প্রায় ৯০ লাখ সিলিন্ডার ব্যবহারকারী আছেন। আর মোট সিলিন্ডারের সংখ্যা সাড়ে তিন কোটি। এসব সিলিন্ডার বাজারজাত করে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৩০টি প্রতিষ্ঠান। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাশের দেশ ভারতে বাসাবাড়িতে ব্যবহারের জন্য বিপুল পরিমাণে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহৃত হলেও বিস্ফোরণের মতো দুর্ঘটনা ঘটে খুবই কম। কারণ সেখানে সিলিন্ডার ও এর যন্ত্রাংশের মান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এর পাশাপাশি সিলিন্ডার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ভারতীয়রা অনেক সচেতন। কিন্তু ওই তুলনায় বাংলাদেশের সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারকারীদের মধ্যে এখনো সেভাবে সচেতনতা তৈরি করা যায়নি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ২ শতাংশ এলপি গ্যাস ও ৫ শতাংশ লাইনের প্রাকৃতিক গ্যাস বাতাসের সংস্পর্শে এলেই তা ভাসতে থাকে এবং একপর্যায়ে তা বিস্ফোরণ থেকে অগ্নিকান্ড ঘটতে পারে। তাই মানসম্মত সিলিন্ডার ব্যবহারের বিকল্প নেই। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। তদারকিও বৃদ্ধি করতে হবে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর।

নিয়মের মধ্যে আসছেন না গ্রাহক-বিক্রেতা, বিধিমালা মেনে ব্যবহার হচ্ছে না সিলিন্ডার

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী ২০২২ সালে এলপিজি সিলিন্ডারজনিত অগ্নিকান্ডে ঘটনা ঘটে ৯৪টি, ২০২৩ সালে ঘটেছে ১২৫টি। অর্থাৎ সিলিন্ডার ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবছর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও বাড়ছে। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী গ্যাসের আগুনে পুড়ে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪ কোটি টাকা। গত বছরে সারা দেশের মোট অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে ২১ হাজার ৭৩টি। এর মধ্যে ইলেকট্রিক, গ্যাস ও মাটির চুলার আগুন ছিল ৩ হাজার ৫৬৪টি। এটি মোট আগুনের ১৬ দশমিক ৯১ শতাংশ। এ আগুনের অধিকাংশই ছিল গ্যাস চুলা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট।

চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তত দুটি এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছে পাঁচজন। আহত হয়েছেন আরো ১০ জন। গড় হিসাবে দেখা গেছে, প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও তিনটি করে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে রান্নাঘরে। এর বাইরে যানবাহনেও এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহারের ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।
গাজীপুরের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (ঢাকা) দেবাশীষ বর্ধন বলেন, দেশে এলপি গ্যাসের ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু যেসব সিলিন্ডারে এ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, সেগুলোর অধিকাংশই মানহীন। এসব সিলিন্ডার যথাযথ প্রক্রিয়ায় মানপরীক্ষা ছাড়া ব্যবহার করা ঠিক নয়, এমনকি সিলিন্ডারের ব্যবহৃত ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সচেতন হতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পয়সা বাঁচানোর জন্য গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সিলিন্ডারে নিম্নমানের রেগুলেটর ও পাইপ ব্যবহার করে থাকেন। এর ফলে এমন অনাকাঙ্কিত দুর্ঘটনা ঘটছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস সিলিন্ডারের স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ১৫ বছর। অথচ ২৮ বছরের পুরনো সিলিন্ডারেও এলপিজি বিপণন হচ্ছে। মূলত মেয়াদোত্তীর্ণ এসব সিলিন্ডারে গ্যাস বিপণনের কারণেই দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ছে। বর্তমানে ব্যক্তি খাতের হাতে এলপি গ্যাস বাজারের ৮০ ভাগের নিয়ন্ত্রণ। বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস সমুদ্রপথে আমদানির পর সিলিন্ডারে ভর্তি করে বিপণন করছে। কিন্তু গ্যাসভর্তি এসব সিলিন্ডার বাজারে সরবরাহ এবং সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে রয়েছে গুরুতর অনিয়ম। দেখা গেছে, কিছু প্রতিষ্ঠান নিয়ম না মেনে গ্যাস সিলিন্ডার ছাড়ছে বাজারে। অনুমোদিত অনেক প্রতিষ্ঠান সিলিন্ডার তৈরি করে বাজারজাত করছে। এর পাশাপাশি অলিগলির দোকানে পুরনো সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। আবার অনেকে অনুমোদন ছাড়াই ঝুঁকি নিয়ে সিলিন্ডারে গ্যাস ভরে তা বিক্রি করছেন। মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারে রং করে নতুন বলে তা বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। মানহীন এসব সিলিন্ডার বিক্রি হলেও দোষীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

সিলিন্ডার ব্যবহার আসলে কতটা ঝুঁঁকিপূর্ণ জানতে চাইলে এলপিজি কোম্পানির ব্যববস্থাপনা পরিচালক ড. নুরূল হুদা বলেন, বাজারে তাদের ৫০ লাখ সিলিন্ডার আছে। প্রতিটির মেয়াদ ২৫ থেকে ৩০ বছর। এই মেয়াদকালে তিনবার সিলিন্ডারের নিরাপত্তা পরীক্ষা হয়। প্রথমে ১০ বছর, এরপর ১৫ বছর, এরপর পাঁচ বছর পর। এছাড়া প্রতিবার গ্যাস ভরানোর সময় তারা হাইড্রো টেস্ট করেন। কোনো সমস্যা দেখলে সেই সিলিন্ডার বাতিল ঘোষণা করেন। তার মতে, দুর্ঘটনা ঘটে ব্যবহারে অসচেতনতা ও অসাধু ডিলারদের অসৎ ব্যবসার কারণে। গ্রাহকরা সচেতন নন। রান্নার সময় সিলিন্ডারটি চুলার কাছে রাখা হয়। এতে সিলিন্ডার উত্তপ্ত হয়ে তার গলে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। অনেক সময় গ্যাসের সংযোগে ত্রুটি থাকে; যা থেকে চুলা ধরানোর সময় দুর্ঘটনা ঘটে।

দৈনিক সরোবর/কেএমএম