add

ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

নতুন কৌশলে দাম বৃদ্ধি

ঈদ ঘিরে মসলার বাজারে আগুন

এসএম শামসুজ্জোহা 

 প্রকাশিত: এপ্রিল ০৩, ২০২৪, ০৬:১৮ বিকাল  

প্রতি বছরই রমজান সামনে রেখে ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। মসলার বাজারেও একই অবস্থা। রমজানের আগেই জিরা, লবঙ্গ, দারুচিনি, গোলমরিচ, জায়ফল, জয়ত্রী ও এলাচদানাসহ সব ধরনের মসলার দাম বেড়েছে অনেক। গরমমসলার বাজার গরম করেছে মসলার রানি এলাচ। দফায় দফায় বেড়ে দুই মাসের ব্যবধানে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। আর বছরের ব্যবধানে চারগুণ বেশি দাম। এখন ভালোমানের এক কেজি এলাচ কিনতে ছয় হাজার টাকা গুনতে হয়। আর বাজারে সাধারণ এলাচ সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরায় অনেক দোকানদার ১০ থেকে ২০ টাকায় এলাচ বিক্রি করতে চান না। এতে বেশি বিড়ম্বনায় পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নতুন কৌশল নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

সাধারণত উৎসব আয়োজন ঘিরে নতুনভাবে দাম বেড়েছে মসলার। তবে এবার আমদানি সরবরাহ ঘাটতিসহ নানা কারণে মসলা পণ্যের দাম বেড়েছে বলে দাবি করছেন ব্যবসায়ীরা। দেশের মসলার বাজার আমদানির ওপর নির্ভরশীল। চাহিদার সামান্য দেশে উৎপাদন হয়। দুই বছর ধরে ডলার সংকটের কারণে মসলা আমদানিকারকদের অনেকেই এলসি খুলতে পারছেন না। এতে মসলা আমদানি কমেছে। 

চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় বাজারে মসলার দাম বেড়েছে। তবে ডলার সংকটের কারণে দাম যতটা বৃদ্ধির কথা, অসাধু ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে বাড়িয়েছে তার চেয়ে বেশি। ব্যবসায়ীদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, সাধারণ ব্যবসায়ীরা এলসি খোলার সুযোগ না পেলেও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের অনেকে ঠিকই এলসি খোলার সুযোগ পাচ্ছে। 

বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, প্রভাবশালীরা মসলা আমদানি করে মজুদ করে রেখেছে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মসলার দাম বৃদ্ধি করছে। এভাবে এসব সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীদের পকেট ভারী হচ্ছে। ফলে সাধারণ ক্রেতারা বাড়তি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

রাজধানীর চকবাজারের একজন গরম মসলা আমদানিকারক আবুল কালাম বলেন, এক মাস আগে কয়েক পদের মসলার জন্য এলসি খুলেছি। তখন ডলারপ্রতি খরচ হয় ১১২ টাকা। এলসির টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে এমন খরচ হয়েছে। ডলারের এই বাড়তি দাম মসলার দাম বাড়ার প্রধান কারণ। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারেও মসলার দাম বেড়েছে। এজন্য আমদানি কমছে। সরবরাহ সংকটে দাম বেড়ে গেছে। অতিরিক্ত দামের কারণে কমেছে মসলা বিক্রিও। রমজানেও এ নিম্নমুখী ভাব থাকবে। অন্য পণ্যের দাম চড়া হওয়ার কারণে মানুষ মসলার ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছে।

বাজার গরম করেছে মসলার রানি এলাচ। দুই মাসের ব্যবধানে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে আর বছরের ব্যবধানে হয়েছে চারগুণ

বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত এক মাসে জিরা কেজিপ্রতি ৩০০ টাকা, এলাচি ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা, দারুচিনি ২৫০ টাকা ও লবঙ্গ ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়েছে। অন্যদিকে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বলছে, গত এক সপ্তাহে জিরার দাম কেজিপ্রতি ৫০০ টাকা, এলাচি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, দারুচিনি ১৫০ টাকা ও তেজপাতার দাম ১০০ টাকা বেড়েছে। তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ে অন্যতম গরম মসলা জিরা ৬০০-৭০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকায়। দারুচিনি গত বছরের তুলনায় ১৩ দশমিক ৪০ শতাংশ বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। লবঙ্গ ১৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮০০ টাকায় এবং এলাচ (ছোট) প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫৫০০ টাকা। ধনে ৬২ শতাংশ বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২৬০ টাকা।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের খুচরা মসলা বিক্রেতা মো. ইব্রাহিম বলেন, প্রায় সব মসলাই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে খুচরা বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ছাড়া উপায় নেই। বাজারে তেজপাতা প্রতি কেজি ২২০ টাকা, আলুবোখারা ৯০০ টাকা, ধনে ২৮০ টাকা ও জায়ফল প্রতিটি ৩৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এদিকে কারওয়ান বাজারে ইন্দোনেশিয়ার শুকনা মরিচের দাম কেজিপ্রতি ১৫০ টাকা বেড়ে ২৫০ টাকা হয়েছে। হলুদের দাম বেড়েছে ৯০ টাকা; মানভেদে কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৮০ টাকা দরে।

কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের পেছনের মসলার দোকানে ঈদের বাজার করতে যান ইন্দিরা রোডের বাসিন্দা শাহেদুজ্জামান খান। তিনি বলেন, যখন মানুষ কোনো পণ্য বেশি কেনে; তখনই দাম বেড়ে যায়। অথচ বিক্রি বেশি হলে লাভ বেশি হয়, এতে দাম কমা উচিত। দেশে গরম মসলা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় সামাজিক ও করপোরেট অনুষ্ঠান এবং হোটেল-রেস্তোরাঁয়। এছাড়া ঘরে ঘরে বেশ কিছু মসলা প্রতিদিন ব্যবহার হয়। এর মধ্যে দেশে সাত ধরনের গরম মসলার চাহিদা বেশি। এগুলো হলো- এলাচ, জিরা, দারুচিনি, লবঙ্গ, গোলমরিচ, জায়ফল ও জয়ত্রী। তবে এসব মসলা পুরোপুরিই আমদানি নির্ভর। দেশে শুধু ধনিয়া, সামান্য জিরা, মরিচ, হলুদ, তেজপাতা, কালিজিরাসহ কয়েকটি মসলা উৎপাদন হয়। তবে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি মসলা আমদানি করা হয় ভারত ও চীন থেকে। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া, মাদাগাস্কার, গুয়েতেমালা, শ্রীলংকাসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও মসলা আমদানি করা হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ২২ হাজার টন জিরা আমদানি হয়েছে; যা আগের বছরের চেয়ে ৬ হাজার টন বেশি। ২ হাজার টন বেড়ে দারুচিনি আমদানি দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার টনে। অবশ্য এলাচি আমদানি কমে ১ হাজার টনে নেমেছে; যা গত বছর ৪ হাজার টন ছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বগুড়া ও বরিশালের কয়েকজন ব্যবসায়ী ঈদ সামনে রেখে হঠাৎ করে বাড়াতে শুরু করে মসলার দাম। তারা সবাই মসলাজাতীয় একাধিক পণ্যের শীর্ষ আমদানিকারক। সরকারের দুর্বল মনিটরিংয়ের কারণে সিন্ডিকেট করার পরও তারা আছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। মসলার বাজারে শীর্ষ আমদানিকারক ৪০ প্রতিষ্ঠান থাকলেও আট প্রতিষ্ঠান একাধিক মসলার অন্যতম আমদানিকারক। একাধিক পণ্যের আমদানিকারক হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে বাজারও নিয়ন্ত্রণ করে তারা। যেমন- চট্টগ্রামের বিআর ট্রেডিং শীর্ষ স্থানে থেকে আমদানি করছে এলাচ, গোলমরিচ, লবঙ্গ ও জিরা। এখানকার আরেক প্রতিষ্ঠান এমকে এন্টারপ্রাইজের ভূমিকা আছে গোলমরিচ ও দারুচিনির বাজার নিয়ন্ত্রণে। ঢাকার আদর ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স ভাই ভাই বাণিজ্যালয়, ঘোড়ামারার পুল মোহাম্মদ ট্রেডার্স, রাজশাহীর হক এন্টারপ্রাইজ এবং দৌলতপুরের সুস্মিতা ইন্টারন্যাশনাল প্রভাব বিস্তার করছে আদা ও রসুনের বাজারে। চট্টগ্রামের ম্যাপ ইন্টারন্যাশনাল আদা, রসুন ও দারুচিনির বাজার এবং ঢাকার হেদায়াত অ্যান্ড ব্রাদার্স নিয়ন্ত্রণ করছে গোলমরিচ ও লবঙ্গের বাজার।

বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এনায়েত উল্লাহ বলেন, টাকার মান কমে যাওয়া, ডিউটি বেড়ে যাওয়া প্রভৃতি কারণে পণ্যের দাম একটু বাড়তি। ডলারের দাম বৃদ্ধিতে মসলা ব্যবসায়ীরা দুইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মসলার এলসি ও নিষ্পত্তিতে খরচ বেড়েছে। এছাড়া মসলার ক্ষেত্রে ডলারের দামের ওপর ভিত্তি করে আমরা ডিউটি দিচ্ছি। তিনি বলেন, গরম মসলার ক্ষেত্রে প্রকারভেদে উচ্চ কাস্টমস ট্যারিফ নির্ধারিত রয়েছে। অর্থাৎ আমি যে দামেই জিরা কিনি না কেন, জিরার ক্ষেত্রে ১৯শ’ ডলার মূল্য ধরে কাস্টমস ট্যারিফ নির্ধারিত হবে। সেটি হবে ডলারের চলমান রেটে। তিনি জানান, মসলার ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ থেকে শুরু করে ১১০-১২০ শতাংশ পর্যন্ত ডিটটি নির্ধারিত হয়েছে। এটা বেশি। 

এনায়েত উল্লাহ বলেন, এসব বিষয়ে আমরা সরকারকে বারবার বলেছি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বৈঠকেও বলেছি। কিন্তু কোনো সুফল পাইনি। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমস্যার কারণেই মসলার দাম বাড়ছে। খুচরা বাজারে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, খুচরা ব্যবসায়ীরা ঈদের সুযোগ নিচ্ছে। একটু দর-কষাকষি করে কিনতে হবে।

দৈনিক সরোবর/কেএমএএ