add

ঢাকা, শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ৩০ চৈত্র ১৪৩০

জাহাজ ছিনতাই: ঈদের আগে জিম্মি নাবিকদের বাড়ি ফেরা অনিশ্চিত

সরোবর ডেস্ক 

 প্রকাশিত: এপ্রিল ০২, ২০২৪, ০৮:০৪ রাত  

বাংলাদেশি মালিকানাধীন মালবাহী জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ ছিনতাইয়ের পর তিন সপ্তাহ পার হতে চললো। সোমালি জলদস্যুদের হাতে জিম্মি জাহাজটির নাবিকরা ঈদের আগে পরিবারের কাছে ফিরতে পারবেন কি না এটি নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। যদিও জাহাজটির মালিকপক্ষ বলছেন, নাবিকদের দ্রুত মুক্ত করতে তারা সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।এমভি আব্দুল্লাহ ছিনতাইয়ের পর প্রথম আট দিন ‘চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়’ কেটেছে জিম্মি নাবিকদের পরিবারগুলোর। নয় দিনের মাথায় সোমালি জলদস্যুরা এমভি আব্দুল্লাহ’র মালিকপক্ষ কবির গ্রুপের সাথে যোগাযোগ করলে কিছুটা আশার আলো দেখতে পান তারা।

এরপর থেকেই আমরা অধীর অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছি যে, কখন ছেলেটা মুক্ত হয়ে ঘরে ফিরে আসে। আমি চাই আমার ছেলে ঈদের আগেই ঘরে ফিরে আসুক -বিবিসি বাংলাকে বলেন ছিনতাই হওয়া জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ’র চিফ অফিসার আতিকুল্লাহ খানের মা শাহানুর বেগম।

এমভি আব্দুল্লাহ’র মালিকপক্ষও জানিয়েছে যে, ঈদের আগে নাবিকদের মুক্ত করতে তারা সব ধরনের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

আমরাও চাচ্ছি ঈদের আগেই এই জিম্মিদশার অবসান হোক এবং সে জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি- বলেন কবির গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদের আগে মুক্তি পেলেও এমভি আব্দুল্লাহ’র নাবিকদের দেশে ফেরানো কঠিন হবে।

জাহাজটি এখন যেখানে অবস্থান করছে, মুক্তি পেলেও ঈদের আগে সেখান থেকে বাংলাদেশে আসা সম্ভব হবে না বললেই চলে-বলেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী। সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে: যতই দিন যাচ্ছে, ততই এমভি আব্দুল্লাহতে সুপেয় পানির সংকট তীব্র হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিফ অফিসার আতিকুল্লাহ খানের মা শাহানুর বেগম। খাবারের সংকট আপাতত নেই, তবে পানির সংকট তীব্র হচ্ছে।পানি শেষ হয়ে যেতে পারে এই ভয়ে এখন নাবিকরা সবাই রেশনিং করে অল্প পানি ব্যবহার করছে। -বলেন তিনি সোমালি জলদস্যুদের কাছে জিম্মি খানের সাথে তার পরিবারের সবশেষ যোগাযোগ হয়েছে রোববার সন্ধ্যায়।

মোজাম্বিক থেকে প্রায় ৫৫ হাজার টন কয়লা নিয়ে দুবাইয়ে যাওয়ার পথে গত ১২ মার্চ ২৩ জন নাবিকসহ এমভি আব্দুল্লাহকে জিম্মি করে সোমালি জলদস্যুরা। তখন জাহাজটিতে প্রায় ২০০ টন বিশুদ্ধ পানি এবং মাসখানেকের হিমায়িত খাবার মজুদ ছিল বলে জাহাজের মালিকপক্ষ জানিয়েছে। এর বাইরে কিছু শুকনা খাবার মজুদ ছিল বলেও জানিয়েছে তারা। ফলে খাবার এবং পানি নিয়ে নাবিকরা সংকটে পড়বেন না বলে জানানো হয়েছিলো। কিন্তু জিম্মি করার পর অন্তত ২০ জলদস্যুর সবাই যখন নাবিকদের খাবারে ভাগ বসান, তখনই মূলত খাবার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

আট দিন পর জাহাজের মালিকপক্ষের সাথে মুক্তিপণের বিষয়ে সমঝোতা শুরু হয়। ততক্ষণে এমভি আব্দুল্লাহও সোমালিয়ার উপকূলে পৌঁছে যায়। ফলে জলদস্যুরা নিজেরাই নিজেদের ব্যবস্থা করায় নাবিকদের মধ্যে খাবার নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমে।

কিন্তু দস্যুরা খাবার পানি এখনও জাহাজ থেকেই নিচ্ছে। সেই কারণেই পানির তীব্র সংকটে দেখা দিয়েছে-বলেন জিম্মি নাবিক আতিকুল্লাহ খানের মা।

এদিকে, মুক্তি পাওয়ার পর জাহাজ নিয়ে রওনা হতে গেলেও সুপেয় পানির প্রয়োজন হবে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

এমনকি জাহাজের ইঞ্জিন স্টার্ট করতে গেলেও বেশ ভালো পরিমাণে ফ্রেশ ওয়াটারের প্রয়োজন হয়।কিন্তু সোমালিয়ায় ফ্রেশ ওয়াটার অতটা সহজলভ্য নয়। কাজেই এটি নিয়ে নাবিকদের দুশ্চিন্তা হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক-বলেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী।

অন্যদিকে, একই জায়গায় গাদাগাদি করে থাকা এবং লোনাপানিতে গোসল করার কারণে জিম্মি নাবিকদের অনেকের শরীরে চুলকানির মতো চর্মরোগ দেখা দিয়েছে বলেও জানা যাচ্ছে। আমার ছেলের আগে থেকেই এলার্জির সমস্যা। ওর শরীরে নাকি এখন চুলকানি হয়ে গেছে-বলেন বেগম। তবে মুক্তিপণের বিষয়ে জাহাজের মালিকপক্ষের সাথে সমঝোতা আলোচনা শুরু হওয়ার পর জলদস্যুরা জিম্মি নাবিকদের সাথে তুলনামূলক ভালো ব্যবহার করছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

সমঝোতা কতদূর?: কয়লাসহ জাহাজ এবং জিম্মি নাবিকদের মুক্ত করতে গত ২০শে মার্চ থেকে জলদস্যুদের সাথে সমঝোতা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এমভি আব্দুল্লাহ’র মালিকপক্ষ কবির গ্রুপ। মূলত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া তৃতীয় একটি পক্ষের সহায়তায় সমঝোতা আলোচনাটি চালানো হচ্ছে।

আলোচনায় বেশ ভালো অগ্রগতি হয়েছে। আলোচনা ঠিকমত না এগোলে জলদস্যুরা এতদিনে হয়তো নাবিকদের উপর অত্যাচার শুরু করে দিত-বলেন কবির গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম।

তার দাবি, আলোচনা ফলপ্রসু হয়েছে বলেই জলদস্যুরা জিম্মি নাবিকদের সাথে ভালো ব্যবহার করছেন। এ ধরনের জাহাজ ছিনতাইয়ের পর জলদস্যুরা সাধারণত মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করে থাকে। এর আগে, ২০১০ সালে এমভি জাহান মনি নামে কবির গ্রুপের আরও একটি জাহাজ ছিনতাই করেছিল সোমালি জলদস্যুরা। তখনও মুক্তিপণ দিয়ে ১০০ দিনের মাথায় সেটি মুক্ত করা হয়েছিলো।

ঈদের আগে ফেরা কঠিন কেন?: জিম্মি করে সোমালিয়া উপকূলে নেওয়ার পর বেশ কয়েকবার অবস্থান পরিবর্তন করতে দেখা গিয়েছিল এমভি আব্দুল্লাহকে। ছিনতাই হওয়ার পর থেকেই স্যাটেলাইট ইমেজ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাহাজটির অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন। তারা বলছে, এমভি আবদুল্লাহ বর্তমানে সোমালিয়ার গদবজিরান এলাকার জিফল উপকূল থেকে প্রায় দেড় নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করছে।

‘মুক্ত হওয়ার পর জাহাজটির প্রথম কাজ হবে নিকটস্থ পোর্টে গিয়ে ফুয়েল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সাপ্লাই নেওয়া’- বলেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোমালিয়া উপকূল ছেড়ে আসার পথে জ্বালানি নিতে হলে এমভি আব্দুল্লাহকে থামতে হবে ওমানের সমুদ্র বন্দরে। সেখানে পৌঁছাতে অন্ততপক্ষে তিন দিন সময় লাগবে বলে জানাচ্ছেন তারা।

‘তখন মালিকপক্ষ চাইলে ওমানে জাহাজের নাবিকদের দল চেঞ্জ করতে পারবেন’ বলেন চৌধুরী। তবে সেজন্য আগে থেকেই নাবিকদের নতুন দলকে ওমানে প্রস্তুত রাখতে হবে। তারা জাহাজের দায়িত্ব বুঝে নিয়ে জাহাজের গন্তব্যস্থল দুবাইয়ের উদ্দেশে রওনা হবে। “কারণ জাহাজের মালগুলো দুবাইয়েই পৌঁছানোর কথা ছিল এবং যেভাবেই হোক সেটি পৌঁছে দিতে হবে। এটাই আন্তর্জাতিক রীতি। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে বেশ কয়েকদিন সময় লেগে যাবে।

অন্যদিকে, ওমানে নেমে যাওয়া নাবিকরা শারীরিক পরীক্ষা ও অন্যান্য আইনগত বিষয় মিটিয়ে তারপর চাইলে বিমানে করে দেশে ফিরতে পারবেন। সব মিলে ঈদের আগে মুক্তি পেলেও বাড়িতে ফিরতে নাবিকদের আরো প্রায় দেড়-দুই সপ্তাহ সময় বেশি লেগে যাবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তথ্যসূত্র: বিবিসি নিউজ বাংলা

দৈনিক সরোবর/এএস