add

ঢাকা, শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ৩০ চৈত্র ১৪৩০

খাদ্যশস্যে নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কা

কৃষিজমিতে গড়ে উঠছে বসতবাড়ি ও প্রতিষ্ঠান

এসএম শামসুজ্জোহা 

 প্রকাশিত: মার্চ ৩১, ২০২৪, ০৬:১৭ বিকাল  

প্রতিনিয়ত দেশে গড়ে উঠছে কল-কারখানা। কোথাও নির্মাণ হচ্ছে বসতবাড়ি, ইটভাটা, নান্দনিক রিসোর্ট বা পিকনিক স্পট। এসব করতে গিয়ে আশঙ্কাজনক হারে কমছে আবাদি জমি। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে। আবার প্রতি বছর কয়েক লাখ নতুন মুখ যোগ হচ্ছে। যত্রতত্র শিল্প-কারখানা ও বাড়িঘর নির্মাণ বন্ধ করে ভূমির সঠিক ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনায় বলেছেন, চাষযোগ্য জমিতে (তিন ফসলি ও দোফসলি) কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান; কোনো বাড়িঘর তৈরি করা যাবে না। অথচ ক্রমাগত কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে।

জানা গেছে, কৃষি উৎপাদনের ওপর দেশের অর্থনীতির ভালোমন্দ নির্ধারিত হয়। অথচ জলবায়ুর প্রভাবে নদীভাঙন, লবণাক্ততা, নগরায়ণ, ইটভাটা, শিল্প-কারখানা, বসতভিটা, রাস্তাঘাট, অবকাঠামো নির্মাণ ও যত্রতত্র বসতি স্থাপনের কারণে সারা দেশে প্রতি বছর প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনে-রাতে ভেকু দিয়ে গভীর গর্ত করে মাটি কাটার মহোৎসবও চলছে। অনেকেই মাটি বিক্রি করে জলাশয় করছে। বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও কৃষিজমির পরিমাণ যে হারে কমছে; তাতে অচিরেই কৃষির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষিজমি ভরাটের ফলে প্রতিদিন মোট কৃষিজমি কমছে ৯৬ বিঘা। 

কৃষিজমি কমা ও করণীয় বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে কৃষি অর্থনীতিবিদ ও সাবেক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেন, কৃষিজমি কমছে এটা বাস্তবতা। না কমার জন্য নীতিমালাও আছে। বাস্তব প্রয়োজনে শিল্পকারখানার জন্য জমি দিতে হয়। জনসংখ্যাও তো বাড়ছে। বর্ধিত জনসংখ্যার ঘরবাড়ি করতে হয় বিভিন্ন কিছু নির্মাণ করতে হয়; সব মিলে কৃষিজমি কমছে। নগরায়ণ করতে গেলেও কৃষিজমি নষ্ট হয়। ভূমির জন্য পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা বলেন এই কৃষি অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, দোফসলি জমি কোনো অবস্থায়ই যেন অন্য কাজে ব্যবহার করা না যায় সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে, মনিটর করতে হবে। যে জমি আছে সেখানে উৎপাদন বৃদ্ধির সর্বশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। 

সারা দেশে প্রতি বছর প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর আগেও যে জমিতে আউশ-আমনসহ রবি মৌসুমে বিভিন্ন জাতের চাষাবাদ হতো, ওই জমিতে ক্রমান্বয়ে বাসাবাড়ি, আবাসিক, বাণিজ্যিক আর বহুতল ভবন গড়ে উঠছে। কৃষি বিভাগের মতে প্রতি বছর দেশে এক শতাংশ হারে কৃষিজমি হ্রাস পাচ্ছে। এর সঙ্গে নাগরিক জীবনের নানা অনুষঙ্গে ও মানবসৃষ্ট কর্মকান্ডে চিরচেনা প্রাকৃতিক পরিবেশ হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষি উৎপাদন ও মাছের আবাসস্থল বিলীন হচ্ছে। কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন কার্যকরের অভাবে আবাদি কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে। প্রতি বছর দশমিক ২৫ শতাংশ বা ৪৫ হেক্টর পরিমাণ কৃষিজমি হ্রাস পাচ্ছে। অর্থাৎ বছরে ৪৫ হেক্টর কৃষিজমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে। 

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, আমরা উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছি। এটা ঠিক কৃষিজমি কমছে এজন্যই আমরা অধিক উৎপাদনে নানা প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী দোফসলি-তিন ফসলি জমি কখনো অকৃষিতে পরিণত না করতে বলেছেন। এটি জাতীয় পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক বিষয়। কত শতাংশ হারে কমছে জানতে চাইলে মহাপরিচালক বলেন, আসলে আমরা মনে করি ১ শতাংশ হারে কমছে।

কৃষিনির্ভর সবুজ-সুফলা বাংলাদেশের রূপ আস্তে আস্তে পাল্টে যাচ্ছে। আধুনিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সরকারি স্থাপনা, অপরিকল্পিত নগরী উন্নয়নের কাজে বিলীন হয়ে যাচ্ছে কৃষিজমি। এছাড়াও জনসংখ্যার চাপে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, মসজিদ-মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষিজমি। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে মাথাপিছু ভূমির পরিমাণ ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সাথে সাথে নগরায়ণের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্রমশ কৃষিজমির পরিমাণ সংকুচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিজমির উপর এক ধরনের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। তবে সরকার বলছে; আমরা সতর্ক আছি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ কৃষিশুমারিতে দেখা গেছে, গত ১১ বছরে আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে ৪ লাখ ১৬ হাজার একর। গত ২০০৮ সালে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৯০ লাখ ৯৭ হাজার একর জমি। ২০২৩ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৮১ হাজার একর। গবেষণায় দেখা যায়, দেশে প্রতি বছর ৬৯ হাজার ৭৬০ হেক্টর আবাদি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ কাজের কারণে প্রতি বছর ৩ হাজার হেক্টর জমি হারিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি-২০১০ এবং কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন-২০১০ অনুসারে কৃষিজমি কৃষিকাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। অথচ আইন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কৃষিজমি ভরাট করে বাড়িঘর, শিল্পকারখানা, ইটভাটা বা অন্য কোনো অকৃষি স্থাপনা হচ্ছে। সেই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন।

এ প্রসঙ্গে কৃষি সচিব ওয়াহিদা আক্তার বলেন, স্বাধীনতা পরবর্তীতে ১৯৭১-৭২ সালে মাথাপিছু জমির পরিমাণ ছিল ২৮ শতাংশ; তা কমতে কমতে এখন দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে। তিনি বলেন, কৃষিজমি কমে যাচ্ছে এটা সত্য। তবে আমরা ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে খাদ্যশস্য উৎপাদন বাড়িয়েছি। আমাদের আরও সতর্ক হওয়া দরকার উল্লেখ সচিব বলেন, দেশের উন্নয়ন হচ্ছে জনসংখ্যা বাড়ছে। কর্মসংস্থানের জন্য তো ইন্ডাস্ট্রিজের দরকার আছে। নতুন পদক্ষেপের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলেছি। যেখানে এক ফসলি জমি আছে ওই সব জমিকে ইন্ডাস্ট্রিজের জন্য দেয়া হবে আর যে সব অঞ্চলের জমি দুই-তিন ফসলি, সেই জমিগুলোকে ইন্ডাস্ট্রিজের জন্য দেয়া হবে না; এগুলোতে শুধু কৃষিকাজের জন্যই রাখা হবে। সচিব ওয়াহিদা বলেন, আমরা প্রথম পর্যায়ে দুই কোটি কৃষকদের জন্য ডিজিটাল কার্ড করতে যাচ্ছি। এখানে তাদের সব তথ্য থাকবে। এর ফলে কার্ডধারী কৃষকদের এলাকাগুলোতে কৃষিকাজের সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে।

দৈনিক সরোবর/কেএমএএ