add

ঢাকা, সোমবার, ২২ জুলাই ২০২৪, ৭ শ্রাবণ ১৪৩১

শেখ হাসিনার চীন সফরে

কোনো চুক্তি হচ্ছে না ২২ সমঝোতা স্মারক সই: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

সরোবর প্রতিবেদক 

 প্রকাশিত: জুলাই ০৭, ২০২৪, ০৯:৫৭ রাত  

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন চীন সফরে ২০ থেকে ২২টি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান। 

তিনি বলেন, কোনো চুক্তি হচ্ছে না। শুধু সমঝোতা স্মারক হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে চীনের রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষের সমঝোতা; অর্থনৈতিক উন্নয়ন নীতি সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা; বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত সহযোগিতা; নবম চায়না ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ নিয়ে সমঝোতা; মেডিক্যাল ও পাবলিক হেলথ বিষয়ে সমঝোতা; রেডিও ও টেলিভিশন সংক্রান্ত সহযোগিতাসহ আরও সমঝোতা।

মোটা দাগে সমঝোতা স্মারকের ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং খাত, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, ডিজিটাল ইকোনমি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি খাতে সহায়তা, ষষ্ঠ ও নবম বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ নির্মাণ, বাংলাদেশ থেকে কৃষিপণ্য রফতানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পিপল টু পিপল কানেকটিভিটি প্রভৃতি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা, জানান মন্ত্রী।

হাছান মাহমুদ বলেন, এভাবে ২০ থেকে ২২টি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। চীন আমাদের বড় উন্নয়ন সহযোগী। চীনের অনেক বিনিয়োগ আছে। তারা আমাদের অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছে। উন্নয়ন ইস্যুটি আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার থাকবে এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা অগ্রাধিকার পাবে।

উল্লেখ্য, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৮ থেকে ১১ জুলাই চীনে সরকারি সফর করবেন। অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র সচিব, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা সফরসঙ্গী হবেন।

প্রধানমন্ত্রীর সফর প্রসঙ্গে হাছান মাহমুদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী সোমবার সকাল ১১টায় বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে বাংলাদেশ ত্যাগ করবেন এবং একই দিন চীনের স্থানীয় সময় বিকাল ৬টায় বেইজিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হবে এবং যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে অভ্যর্থনা জানানো হবে।

৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রী এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিন লিকুনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। একই দিন প্রধানমন্ত্রী সাং-গ্রি-লা সার্কেলে অনুষ্ঠেয় ‘সামিট অন ট্রেড, বিজনেস অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট অপরচুনিটিস বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড চায়না’ শীর্ষক সম্মেলনে অংশ নেবেন। ওই দিন দুপুরে প্রধানমন্ত্রী চীনের পিপলস পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্সের ১৪তম জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান ওয়াং হানিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন।

১০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সাক্ষাতের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে একটি অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। একই স্থানে প্রধানমন্ত্রী ও চীনের প্রিমিয়ার অব দ্য স্টেট কাউন্সিল দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলসহ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবে।

ওই দিন বিকালে প্রধানমন্ত্রী চীনের রাষ্ট্রপতি শি চিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর উপলক্ষে বাংলাদেশ ও চীন একটি যৌথ বিবৃতি দেবে।

এরপর ১১ জুলাই বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সফরসঙ্গীরা চীন থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হবেন। দুপুর ২টায় তাদের ঢাকা অবতরণের কথা রয়েছে বলেও জানান হাছান মাহমুদ। 

তিস্তা প্রকল্পে ভারতের প্রস্তাব বিবেচনা করতে হবে: সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তিস্তা বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ নদী। তবে তিস্তা প্রকল্পের জন্য ভারত একটি টেকনিক্যাল টিম পাঠাবে। এ ক্ষেত্রে ভারতের প্রস্তাব বিবেচনা করতে হবে। চীনের প্রস্তাবও ভালো।

প্রধানমন্ত্রীর সফরে তিস্তা আলোচনা উঠবে কিনা জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তারা (চীন) এ বিষয়টি উঠালে আলোচনা হবে।

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকালে অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের  প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র সচিব, অন্যান্য সচিবসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা সফরসঙ্গী হবেন।

যে বিষয়ে চীনের সঙ্গে পরে আলাপ করতে চায় বাংলাদেশ: চীনের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই) নিয়ে এ মুহূর্তে আলোচনা করতে চায় না বাংলাদেশ। সংবাদ সম্মেলনে জিডিআই নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, আমার মনে হয় এটি নিয়ে পরে আলাপ করবো, আজ নয়।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে ঢাকা সফরকালে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই তাদের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের বিষয়ে বাংলাদেশকে অবহিত করেন এবং যুক্ত হতে অনুরোধ করেন। এবারের সফরে চীন তাদের ওই আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করেছে।

তিব্বত ও তাইওয়ান বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা যেকোনও দেশের সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতায় বিশ্বাস করি।

রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য চীন থেকে ঋণ সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু এ বিষয়ে পরিষ্কার কোনও উত্তর দেননি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, প্রথমত কোনও ঋণচুক্তি বা সমঝোতা স্মারক আমাদের তালিকায় নেই। অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা হবে।

ঋণের পরিমাণ নিয়ে আবার জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে ঋণের কোনও পরিমাণ নেই (দেয়ার ইজ নো অ্যামাউন্ট)। এ বিষয়ে কোনও চুক্তি হচ্ছে না। আমাদের একটি জেনারেল সমঝোতা হচ্ছে। যেহেতু অর্থনেতিক সহযোগিতা হবে, সেই সমঝোতার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী আমাদের অগ্রাধিকারের নিরিখে এবং আমাদের মধ্যে সমঝোতা হলে তখন ব্যাংকিং বা অর্থনৈতিক খাতে সহযোগিতা হবে। আপনি রিজার্ভের কথা বলছেন, আমাদের রিজার্ভ এখন ভালো আছে। রিজার্ভ ধীরে ধীরে বাড়ছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রিজার্ভ সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সাংবাদিকদের এমন মন্তব্যের পর মন্ত্রী বলেন, সমঝোতা স্মারকের তালিকায় এমন প্রস্তাবের কথা বলা নেই। এটি আলোচনা হতে পারে। কিন্তু এ ধরনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছি বলে আমার জানা নেই।

তিস্তা প্রকল্প: বাংলাদেশের অনুরোধে তিস্তা প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়েছিল চীন। তবে এই সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ওই প্রকল্প নিয়ে আলোচনা উত্থাপন করা হবে না। এই তথ্য জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিস্তা যদি তারা আলোচনায় আনে, তাহলে আলোচনা হবে।

তিনি বলেন, তিস্তা নদী দুই দেশের যৌথ নদী– বাংলাদেশ ও ভারতের নদী। এখন যৌথ নদী নিয়ে ভারত একটি প্রস্তাবনা দিয়েছে এবং একইসঙ্গে ভারত থেকে একটি কারিগরি দল আসবে বলে আমাদের জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে যৌথভাবে সমীক্ষা করে কীভাবে কী প্রয়োজন সেটি বিবেচনা করা হবে। যেহেুতু এটি যৌথ নদী এবং যাদের সঙ্গে এই যৌথ নদী, তাদের প্রস্তাব আছে, সুতরাং আমাদের সেই প্রস্তাবটি আগে বিবেচনা করতে হবে, স্বাভাবিকভাবে।

চীনও একটি প্রস্তাব দিয়েছে এবং সেটিও খুব ভালো। কিন্তু যেহেতু ভারত একটি প্রস্তাব দিয়েছে, আমরা মনে করি সেটি ভালো দিক, যেহেতু এটি আমাদের দুই দেশে যৌথ নদী বলে তিনি জানান।

বাণিজ্য বৈষম্য: বাণিজ্য বৈষম্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য বৈষম্য অনেক বেশি। এই বৈষম্য মেটানোর জন্য আমরা যাতে আরও বেশি করে কৃষি এবং অন্যান্য পণ্য রফতানি করতে পারি, এ ক্ষেত্রে অশুল্ক বাধাসহ অন্যান্য যে বাধাগুলো আছে সেগুলো যাতে তুলে নেওয়া হয় এবং তাদের আমদানিকারকদের যাতে উৎসাহিত করা হয়, সেটি আমরা বলবো।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির যে সমঝোতা স্মারক নবায়নের কথা রয়েছে সেটি এ সফরে হবে না। বরং পরে আওয়ামী লীগের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল, যার নেতৃত্ব দেবেন প্রেসিডিয়াম সদস্য, তারা চীনে যাবে। সেই সময়ে এটি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মন্ত্রী জানান।

দৈনিক সরোবর/এএল