add

ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১

আজিজের ভাইদের এনআইডি জালিয়াতি তদন্তে কমিটি

সরোবর প্রতিবেদক  

 প্রকাশিত: জুন ১০, ২০২৪, ০৮:০১ রাত  

সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে‘মিথ্যা তথ্য’ দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়ার অভিযোগ তদন্তে কমিটি করার কথা জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল।

সোমবার নির্বাচন ভবনের মিডিয়া সেন্টারে নির্বাচন কমিশনের সংবাদ সংগ্রহে নিয়োজিত সাংবাদিকদের সংগঠন ‘আরএফইডি টক’ এ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

সিইসি বলেন, আজিজ সাহেবের ভাই বোন, হারিছ চৌধুরী (খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় তার রাজনৈতিক সচিব), বঙ্গবন্ধুর খুনি মোসলেম উদ্দিনের পরিবার ভুল তথ্য দিয়ে এনআইডি করেছে জেনেছি। ২০-২৫ বছর পর হঠাৎ জানা গেল। এখন দুটো তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আজিজ আহমেদের দুই ভাই হারিছ আহমেদ ও তোফায়েল আহমেদ (জোসেফ) নিজেদের নামের পাশাপাশি বাবা-মার নামও পরিবর্তন করেছেন। হারিছ আহমেদ তার নাম পাল্টে হয়েছেন মোহাম্মদ হাসান। আর তোফায়েল আহমেদ জোসেফ নাম পাল্টে পরিচিতি নিয়েছেন তানভীর আহমেদ তানজীল। তাদের এনআইডির তথ্য পরিবর্তনে আজিজ আহমেদ সুপারিশ করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সিইসি বলেন, অপরাধ জানার পরও অপরাধ হচ্ছে। যিনি পাঁচটি (একাধিক) এনআইডি করছেন, তিনি অপরাধ করছেন। কোনো না কোনো ফাঁক ফোকরের সুযোগে অপরাধ করছে। কিন্তু তিনি (যিনি অপরাধ করেন) যে নির্মল ব্যক্তিত্ব, সেটা বলছি না, কোনো সাফাই করি না। তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কোভিডের সময় রিপোর্ট জালিয়াতি ও সাম্প্রতিক সময়ে কারিগরি বোর্ডের সার্টিফিকেট জালিয়াতির প্রবণতার বিষয়টি তুলে ধরেন সিইসি।

তিনি বলেন, এনআইডি একটা প্রযুক্তিগত দিক রয়েছে। এ প্রযুক্তির ফাঁক ফোকর থাকতে পারে।...একটা জিনিসের ৯৯.৯৯ শতাংশ লোক সুবিধা পেয়ে থাকে, ০.০১ শতাংশ লোক যদি এর অপব্যবহার করে; তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

এনআইডি জালিয়াতিতে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পাওয়া ডেটা এন্ট্রি অপারেটরদের দায় থাকতে পারেন বলে মনে করেন সিইসি।তিনি বলেন, স্থায়ী চাকরি করে তারা নয়, ডেটা এন্ট্রি অপারেটররা হয়ত প্রলুব্ধ হয়ে, লোভের বশবর্তী হয়ে কিছু কিছু কাজ করেছে। ব্যাপকভাবে হয়েছে তা কিন্তু নয়। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে আজিজ আহমেদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

কী অভিযোগ:

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিথ্যা তথ্য দিয়ে মোহাম্মদ হাসান নামে ২০১৪ সালে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিয়েছিলেন হারিছ আহমেদ। ২০১৯ সালে তিনি এনআইডিতে নিজের ছবি পরিবর্তন করেন। আজিজ আহমেদের আরেক ভাই তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফ দুটি এনআইডি নিয়েছেন। এর একটি মিথ্যা তথ্য দিয়ে, তানভির আহমেদ তানজীল নামে। অন্যটি করেছেন তোফায়েল আহমেদ জোসেফ নামে। আইন অনুযায়ী, মিথ্যা তথ্য দিয়ে এনআইডি করা এবং একাধিক এনআইডি করা—দুটিই শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

সাজা মওকুফ চেয়ে (জোসেফের জন্য) মায়ের করা আবেদনসহ সাজা মওকুফের সরকারি প্রজ্ঞাপনে হারিছ ও জোসেফের বাবার নাম আব্দুল ওয়াদুদ ও মায়ের নাম রেনুজা বেগম। কিন্তু হারিছ যে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট নিয়েছেন, তাতে বাবার নাম সুলেমান সরকার এবং মায়ের নাম রাহেলা বেগম উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ হাসান নামে হারিছ আহমেদের জাতীয় পরিচয়পত্র ইস্যু করা হয়। ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট তিনি এনআইডিতে নিজের ছবি পরিবর্তন করেন।

প্রথম আলো লিখেছে, ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ছবি পরিবর্তনের আবেদন করেন মোহাম্মদ হাসান (হারিছ)। ওই দিনই ছবি পরিবর্তনের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। তার আবেদনে রেফারেন্স হিসেবে লেখা আছে—‘জেনারেল আজিজ আহমেদ, সিএএস’। সিএএস হলো চিফ অব আর্মি স্টাফ। নাম পাল্টে তৈরি করা জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে দুই ভাই পাসপোর্ট করেছেন। এই মুহূর্তে তারা দেশের বাইরে আছেন। তবে প্রথম আলোর প্রশ্নে আজিজ আহমেদ দাবি করেছেন, ওই অভিযোগ সত্য নয়।

আজিজ আহমেদের ভাই হারিছ আহমেদের স্ত্রী দিলারা হাসান ও তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফের স্ত্রী শামীম আরা খানও ভুয়া তথ্য দিয়ে ই পাসপোর্ট নিয়েছেন বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা:

২০১৮ সালের জুন থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছর বাংলাদেশের চিফ অব আর্মি স্টাফ ছিলেন জেনারেল আজিজ আহমেদ। তার আগে ২০১২ সাল থেকে চার বছর বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির নেতৃত্ব দেন। সেনাপ্রধান হিসেবে মেয়াদের শেষ সময়ে আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ তোলা হলে সরকার এবং সেনাসদর সে সময় প্রতিবাদ জানিয়েছিল। আজিজ আহমেদও অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।

অবসরে যাওয়ার প্রায় তিন বছর পর গত ২০ দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল আজিজ আহমেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে আজিজ আহমেদ এবং তার পরিবারের সদস্যরা সাধারণভাবে ‘যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অযোগ্য’ বিবেচিত হবেন।

পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলারের বিবৃতিতে বলা হয়, উল্লেখযোগ্য দুর্নীতিতে জড়িত থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট, ফরেন অপারেশন অ্যান্ড রিলেটেড প্রোগ্রামস অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস অ্যাক্টের ৭০৩১ (সি) ধারার আওতায় বাংলাদেশের সাবেক জেনারেল আজিজ আহমেদের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তার কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়ার ওপ জনগণের বিশ্বাসকে ক্ষুণ্ন করতে ভূমিকা রেখেছে। ২১ মে যমুনা টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, সত্যিকার অর্থে এটা এম্বারাসিং-আমেরিকা কেন করল, কী করল আই ডু নট নো। দিস ইজ ভেরি আনফরচুনেট।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আজিজ আহমেদ নিজের ভাইকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি এড়াতে সহযোগিতা করতে গিয়ে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করেন এবং এর মধ্য দিয়ে উল্লেখযোগ্য দুর্নীতিতে সম্পৃক্ত হন। তাছাড়া অন্যায়ভাবে সেনাবাহিনীর কাজ পাওয়া নিশ্চিত করার জন্য তিনি তার ভাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য সরকারি নিয়োগের বিনিময়ে ঘুষ নিয়েছেন।

মঙ্গলবার যমুনা টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আজিজ আহমেদ বলেন, প্রথমে এক কথায় বলব, সত্যি আমি অবাক হয়েছি। আমার এক বন্ধু আমাকে কপিটা (নিষেধাজ্ঞার বিবৃতি) পাঠিয়েছে। প্রশ্নের উত্তরে যাওয়ার আগে একটা বিষয় জানতে চাচ্ছি, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ আলজাজিরাতে ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ নামে একটি নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র এই নিষেধাজ্ঞায় যে অভিযোগগুলো দিয়েছে, সেগুলো আলজাজিরার ওই ডকুমেন্টারিতে ছিল। আমি দেখতে পাচ্ছি ওই অনুষ্ঠানে যে অভিযোগ দুটো আনা হয়েছিল সেটার সাথে সম্পৃক্ত। একচুয়ালি সেই জিনিসটাই, যদিও এখানে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। কিন্তু অভিযোগ দুইটা একই।

সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ বলেন, প্রথম অভিযোগ হচ্ছে, আমার ভাই অপরাধ কর্মকাণ্ড করে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন যেন এড়িয়ে চলতে পারে, সেজন্য আমি সহযোগিতা করেছি। প্রথমটার উত্তর হচ্ছে, আমার সেই ভাই আমি জেনারেল হওয়ার অনেক আগে থেকেই বিদেশে। নিশ্চয় সে বৈধ পাসপোর্ট নিয়েই গিয়েছে। সেখানে তার দেশ থেকে চলে যাওয়ার বা দেশের প্রচলিত আইন ফাঁকি দেওয়ার বিষয়ে আমি আমার পদ-পদবি ব্যবহার করেছি, এই অভিযোগ আমি মেনে নিতে পারি না। এটা সঠিক নয়।

নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে যুক্তিখণ্ডন করতে গিয়ে তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় অভিযোগ হচ্ছে, সেনাপ্রধান হিসেবে আমার ভাইকে একটা সামরিক কন্ট্রাক্ট দিয়ে আমি ঘুষ নিয়েছি, আমি দুর্নীতি করেছি। আমি চার বছর ডিজি বিজিবি থাকাকালে কিংবা তিন বছর সেনাপ্রধান থাকাকালে আমি আমার কোনো ভাইকে বা কোনো আত্মীয়কে কোনো কন্ট্রাক্ট দিয়েছি- এমন যদি কেউ প্রমাণ করতে পারে, আমি যে কোনো পরিণতি মেনে নিতে প্রস্তুত আছি।

অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল আজিজ বলেন, আপনারা গিয়ে খোঁজ নেন, আমার ভাইদের কারও বিজিবি বা সেনাবাহিনীতে ঠিকাদারি করার মত কোনো লাইসেন্স আছে কি না। আমার ভাইদেরকে কন্ট্রাক্ট দিয়েছি এ অভিযোগের তারা তথ্যপ্রমাণ দিক, আমি মেনে নেব। তারা এসে আমাকে বলুক, আপনার এই ভাইকে এই কন্ট্রাক্টটা দিয়েছি।

যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের পর সরকারের পক্ষ থেকে কোনো দায় নেওয়া হয়নি। ২২ মে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, যে দপ্তর থেকে বা যে আইনের অধীনে তার (আজিজ আহমেদ) ওপর ভিসা রেস্ট্রিকশন দেওয়া হয়েছে, সেটিতো দুর্নীতির কারণে। এটা পার্সোনাল দায়। এটাতো ইনস্টিটিউশনাল (প্রাতিষ্ঠানিক) কোনো বিষয় নয়, পার্সোনাল দায় এবং সেখানে বলাও হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর খুনির পরিবারেরও ’একই কাজ’: আজিজ আহমেদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পর তার ভাই ও ভাতৃবধূদের এনআইডি ও পাসপোর্ট জালিয়াতির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এর মধ্যে গত ৩০ মে প্রকাশ পায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পলাতক আসামি রিসালদার মোসলেম উদ্দিনের চার ছেলে মেয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) তাদের বাবার নাম পাল্টেছেন। ‘ভুয়া’ পরিচয়পত্র ব্যবহার করে তিন ছেলে-মেয়ে পাসপোর্ট এবং এক ছেলে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের অনুরোধে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এনআইডি শাখা এ তদন্তে নেমেছে।

মোসলেম উদ্দিনের ছেলে-মেয়েরা বাবার নাম বদলে এনআইডিতে মো. রফিকুল ইসলাম খান লিখিয়ে নিয়েছেন। কীভাবে এটা করা হল, এর সঙ্গে কারা জড়িত, সেসব খুঁজে বের করতে কাজ শুরু হয়েছে।

দৈনিক সরোবর/এমএস