add

ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১

হঠাৎ মসলার দাম বৃদ্ধি

ঈদ ঘিরে অসাধু তৎপরতায় অস্থির বাজার

এসএম শামসুজ্জোহা 

 প্রকাশিত: জুন ০৯, ২০২৪, ০৬:২৭ বিকাল  

পবিত্র ঈদুল আজহার বাকি এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময়। এ ঈদের অন্যতম অনুষঙ্গ মসলা। আর এতে দেশের প্রতিটি বাজারেই মসলার দোকানে বেড়েছে বেচাবিক্রি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মসলার দোকানগুলোয় ভিড় জমাচ্ছেন ক্রেতারা। তবে ঈদের আগেই হঠাৎ মসলাজাতীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি করা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা। তাদের দাবি, কোরবানির বাকি এখনো প্রায় এক সপ্তাহ। এর মধ্যেই ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে ফেলেছেন। তা নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে ক্রেতাদের। ঈদ ঘিরে সিন্ডিকেটের অসাধু তৎপরতায় অস্থির হয়ে পড়েছে দেশে মসলার বাজার। ফলে সরবরাহে ঘাটতি না থাকলেও বেড়েছে প্রায় সব ধরনের মসলার দাম।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোরবানির ঈদ ঘিরে তিন মাস আগে থেকেই মসলা আমদানি শুরু করেন ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা। এর ফলে দেশের বাজারে বিপুল পরিমাণ মসলা আমদানি হলেও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে প্রতিদিনই লাফিয়ে বাড়ছে মসলার দাম।

বিক্রেতারা বলছেন, আমদানিকারকরা দাম বৃদ্ধি করা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে মসলা। ফলে তাদেরৎও তুলনামূলক বেশি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে এসব পণ্য। মসলা বিক্রেতারা বলছেন, দেশিয় বাজারে যেসব মসলা বিক্রি হচ্ছে; তার অধিকাংশই ভারত থেকে আমদানি করা। হিলি স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিনই জিরাসহ অন্যান্য মসলা আমদানি হচ্ছে। আগে প্রতিদিন দুই-তিন ট্রাক মসলা আমদানি হলেও কোরবানি উপলক্ষে এখন হচ্ছে ৮ থেকে ১০ ট্রাক।

ব্যবসায়ীদের দাবি, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া ও এলসি খোলায় জটিলতার কারণেই মসলার দাম বেড়ে গেছে। তবে নিয়মিত বাজার তদারকি হলে এত দাম বাড়ত না বলেও মনে করেন কোনো কোনো ব্যবসায়ী।

বাজারদর ও পাইকারি মসলা ব্যবসায়ীদের তথ্য মতে, গত তিন থেকে ছয় মাসে মসলা পণ্যের দাম ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ডলার সংকট এবং নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কের কারণে আমদানিতে ব্যাঘাত ঘটায় সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিয়েছে দেশের মসলার বাজারে। আর এতে গত তিন মাসে অনেকটাই বেড়েছে মসলার দাম। এর পাশাপাশি আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে মসলা পণ্যের বাজার আরও অস্থির হয়ে উঠেছে। সরবরাহ সংকটের সুযোগে বাড়তি মুনাফা করতে আমদানিকারকরা বাজার অস্থির করে তুলছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।  
বাংলাদেশ মসলা আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি অমর কান্তি দাশ বলেন, এলাচের দাম টন প্রতি যেখানে ১২ থেকে ১৩ হাজার ডলার ছিল, তা বেড়ে এখন ৩০ হাজার ডলার হয়েছে। এ কারণে এলাচসহ প্রায় সব ধরনের মসলার দাম বেড়েছে। তবে বাজার মনিটর জোরদার করা হলে কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
 
সরবরাহে ঘাটতি না থাকলেও বেড়েছে প্রায় সব মসলার দাম
 
জানা গেছে, টাকার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি নানা অজুহাতে কোরবানির আগেই মসলার বাজারে এমন অস্থিরতা। অথচ এসব মসলা আমদানি হয়েছে তিন থেকে চার মাস আগে। আর চাহিদার বিপরীতে অতিরিক্ত আমদানি হওয়ায় এ মুহূর্তে বাজারে মসলার কোনো সংকট নেই বলে দাবি কাস্টমসের। ভারত থেকে আমদানি কম হওয়ার অজুহাতে গত দুমাস ধরেই দেশের বাজারে এলাচের দাম লাগামহীন। দুহাজার টাকা কেজি এলাচের দাম এসে ঠেকেছে চার হাজার টাকায়। এবার শুধু এলাচ নয়, অজুহাতের ওপর ভর করে জিরা, লবঙ্গ, দারুচিনি, গোলমরিচ এবং জয়ত্রির দাম ইছোমতো বাড়িয়ে দিয়েছেন পাইকারি বিক্রেতারা। বিশেষ করে পবিত্র ঈদুল আজহার দিন যতোই ঘনিয়ে আসছে; ততোই অস্থির হয়ে উঠছে মসলার বাজার।

মসলা আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা জানান, জিরা ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো মসলা পণ্যের দাম তেমন বাড়েনি; বরং কিছু কিছু পণ্যের দাম আগের চেয়ে কমেছে।  বাজার দর ও পাইকারি মসলা ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, গত তিন থেকে ছয় মাসে মসলা পণ্যের দাম ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ, প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে জিরার দাম। মধ্যবিত্ত ভোক্তাদের প্রধানতম গরম মসলার একটি জিরা। কিন্তু জিরা, দারুচিনি, লবঙ্গ, গোলমরিচ ও এলাচের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি আসন্ন কোরবানির ঈদে ভোক্তাদের ওপর চাপ তৈরি করবে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। এলাচের আমদানিকারক রশিদ-উন-নবীর দাবি, এখন এলাচ আমদানিতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ককর দিতে হয়। এই এলাচ শুল্কায়ন করা হয় ২৫ ডলারে; অথচ এর আমদানি মূল্য সাত ডলার। শুল্কায়ন মূল্য বেশি ধরার কারণে কেজিতে শুল্ককর বেশি দিতে হচ্ছে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। যে কারণে দাম হু হু করে বাড়ছে।

বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে প্রতিকেজি জিরা বিক্রি হচ্ছে ৮৭০ থেকে ৯৫০ টাকায়। বিভিন্ন হাত ঘুরে এই জিরা খুচরা পর্যায়ে ১,০০০ টাকারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। দেশের অন্যতম প্রধান পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানান, তিন মাস আগেও ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে জিরা; যা বর্তমান দামের চেয়ে প্রায় ৬৫০ টাকা কম। একইভাবে কেজিতে ৫০০ টাকা বেড়ে বর্তমানে প্রতিকেজি এলাচ ১,৫০০ টাকা; ৭০০ টাকা বেড়ে লবঙ্গ ১,৫০০ টাকা; ১,০০০ টাকা বেড়ে জায়ফল ৩,৫০০ টাকা; ২০০ টাকা বেড়ে মিষ্টি জিরা ৩১০ টাকা; ১৫০ টাকা বেড়ে গোলমরিচ ৬৭০ টাকা; ১৫০ টাকা বেড়ে জয়ত্রী ৭৫০ টাকা; ৭০ টাকা বেড়ে দারুচিনি ৩২০ টাকা; ৬০ টাকা বেড়ে ধনিয় ১৮০ টাকা; ৫০ টাকা বেড়ে সরিষা ১০৫ টাকা এবং ২০ টাকা বেড়ে তেজপাতা বিক্রি হচ্ছে ৯৫ টাকায়।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রতীক দত্ত বলেন, পাইকারি ব্যবসায়ীরা সঠিক রসিদ রাখেন না। এক মাস আগে অভিযানে আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে; প্রতি কেজি এলাচ ১৫ শতাংশ মুনাফাসহ বিক্রয়মূল্য হওয়ার কথা সর্বোচ্চ এক হাজার ৭০০ টাকা। কিন্তু বাজারে বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার টাকায়। তখন বেশকিছু প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করেছিলাম। এখনো আমাদের বাজার তদারকি চলমান। আমরা অসাধু ব্যবসায়ীদের তালিকা করছি। তাদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসব।

মসলা আমদানিকারক মেসার্স অসীম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধীকারী অসীম কুমার দাশ জানান, বাংলাদেশের অধিকাংশ মসলা পণ্যই আমদানি হয় বিশ্ববাজার থেকে। এক সময় ব্যবসায়ীরা ৮২ থেকে ৮৪ টাকার ডলার দিয়ে পণ্য আমদানি করত। এখন ডলারের সর্বোচ্চ দাম ১১৮ টাকা। পণ্যের দামের ওপর শুল্ক নির্ধারণ হওয়ায় আমদানি খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এ কারণে মসলা পণ্যের দাম অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশি। এছাড়া বিলাসী পণ্য হিসেবে মসলা আমদানিতে শুল্ক-কর বৃদ্ধি ছাড়াও আমদানি কমে যাওয়ায় আসন্ন কোরবানির ঈদে দেশে মসলার দাম চড়া থাকবে বলে শঙ্কা জানিয়েছেন তিনি।

দৈনিক সরোবর/কেএমএএ