add

ঢাকা, বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

চূর্ণসম্ভাষণ ৬: দুটি কবিতা বইয়ের পান্ডুলিপি

রাগীব হাসান

 প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৪, ০৫:১৬ বিকাল  

কবিতায় কেউ এক দশক থাকলে কবিতা ছাড়াও কবিতার মানুষদের ব্যাপারে তার অনেকটাই জানা হয়ে যায়। এক দশক কেন যদি এর চেয়েও কম সময় থাকে, তাহলেও একটা জানার পরিধি তৈরি হয়। কবিদের নিশ্চয় নিজস্ব একটা ধরন থাকে, বৈশিষ্ট্য থাকে, এটা নিয়ে কবি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন। কবিতা অঙ্গনে কবিবন্ধু বলেও একটি কথার প্রচল আছে। এ কথার অর্থ যেটা দাঁড়ায় বলে মনে হয়, তা হলো যারা কবিতা লিখতে আসেন, এই কবিতা লেখার সূত্রে পরস্পরের মধ্যে যে ঘনিষ্ট সম্বন্ধ গড়ে ওঠে, তখন তা বন্ধুত্বে রূপ নেয়। তখন কবিবন্ধু কথাটি আমাদের মুখ থেকে বের হয়। আমার ধারনা, এক এক কবির কবিবন্ধুর সংখ্যার মধ্যে তারতম্য রয়েছে মানে সংখ্যা কারোর বেশি কারোর কম হতে পারে।

poem

এবার ব্যক্তিগত জায়গা থেকে কথা উচ্চারিত হতে পারে। কবিতা লেখার সূত্রে, আমারও দু-চার জন কবি বন্ধু আছে। তবে একটা কথা সবার জানা, সময় যত সামনে এগিয়ে যায়, নানা বাস্তবতায় কবিবন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগটাও ক্ষীণ হয়ে আসে, আবার বাড়তেও পারে। দু-রকমই হতে পারে বলে মনে হয়। তবে আমার বেলায় প্রথমটাই সত্য হয়েছে। বাস্তবতার গ্যারাকলে পড়ে দু-চার জন কবিবন্ধু যা আছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগটা কমতে কমতে শূন্যে নেমে এসেছে। এতে আমার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে মনে হয় এবং এই ক্ষতির বৃদ্ধিই ঘটে চলেছে। কিন্তু আমার কিছু করার নেই। তবে এ জন্য মানসিক একটা যন্ত্রণা, ভয়ানক পীড়া অনুভব করি।

poem

কবিতা লেখাটা একাকীর কাজ। কিন্তু কবিতা লেখকের পক্ষে একলা থাকাটা কষ্টকর। তাই সে মেলামেশার জন্য এগিয়ে আসে, যুগে-যুগে। সমমনস্ক মানুষের খোঁজে। বলা ভালো সমমনস্ক কবিতা-লেখকের সন্ধানে। সন্ধান পেয়েও যায়। জয় গোস্বামী, গোঁসাইবাগান। অতীতকে একটু মনে করলে দেখি যে এই রাজধানীতে ভাত-কাপড়ের যোগারের চেষ্টার পরেও কবি-আড্ডায় হাজির থেকেছি। তার মধ্যে এক-দুই জন কবিবন্ধুর সঙ্গে একান্তে কবিতা নিয়ে কথা হয়েছে। কবিতা রাজ্যের নানা বিষয় জানা হয়ে গেছে, যা আমার আগে জানা ছিল না। এই জানার অভিজ্ঞতা উপকারি বলেই মনে হয়েছে। কবিতা রাজ্যের নীরব হাওয়া, ঘূর্ণি হাওয়া সম্বন্ধে কবিতা রাজ্যে বিচরণশীল এক কবিবন্ধুই এসব তথ্যের যোগান দিত আমাকে, তার সঙ্গে বহুদিন ধরেই যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে এসেছে। ফোনে যে কথাবার্তা হত, তাও প্রায় বন্ধ। তবে সে আগের মতোই বিচরণশীল রয়েছে, কিছুটা বা বেড়েছে। কবিতা লেখাটা একাকীর কাজ। কিন্তু কবিতা লেখকের পক্ষে একলা থাকাটা কষ্টকর- কবি জয় গোস্বামীর এই কথাটি মারাত্মক ও সাঙ্ঘাতিক একটি কথা। তাই কবি লেখক অন্য কবি লেখকের সঙ্গে মিশতে উদগ্রীব থাকে। এই ব্যগ্র-তাড়নাটি আমার মধ্যেও আছে। কিন্তু মনে হয় অনেকদিন ধরেই বাস্তবতা এমনভাবে পিষ্ট করে যাচ্ছে, ওই কবি লেখকদের সঙ্গে মেলামেশা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে উঠেছে, অবশ্য এ পরিস্থিতি বদলে যাবে বলে আমি আশাবাদী। আমি এ বিশ্বাস করি, পরিস্থিতি পক্ষে আনার জন্য যে অবিরত চেষ্টা, তার কোনও খামতি নেই। এখন আমি কবিতা রাজ্যের কেউ নন যারা, তাদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে দিব্যি সময় কাটিয়ে দিতে পারি। 

অমর একুশে বই মেলা চলছে। পরপর দু-বই মেলাতেই যাওয়া হয়নি। ইচ্ছেই জাগেনি যাওয়ার। এবারও ঠিক যাবো কিনা, জানি না। ঢাকার অমর একুশে বইমেলা মিলনমেলায় পরিণত করে। মেলা উপলক্ষে কবি-লেখকের পদচারণা স্পষ্ট দেখা যায়। মেলায় ছোট কাগজগুলোর যে অংশটি তাতে গিয়ে দাঁড়ালে খুব ভালো লাগে, প্রত্যেকেরই ভালো লাগে বলে বিশ্বাস। মেলা উপলক্ষ্যে অধিকাংশ বই বের হয়। কবিদের বইও মেলাকে কেন্দ্র করে বের হওয়ার রেওয়াজটি চালু। অন্য সময়ে বের হয় বলে জানা যায় না। ২০১৮ সালে আমার ‘মাতৃসদনের দেবদারু’ ও ২০২০ সালে ‘পুণ্যতীর’ কবিতার বই দুটি বের হয়। ১৯৯৯ সালে ‘সমন্বয়ের নানাজাতীয় তীরন্দাজ’ কবিতার বইটি দিয়ে অমর একুশের বইমেলায় আত্মপ্রকাশ। মজার বিষয় হলো, অনেক কবি-লেখক আছেন, মেলায় তাদের প্রায় প্রতিদিন উপস্থিতি থাকে। মনে হয়, এতে অন্যদের সঙ্গে দৃঢ় একটি সম্বন্ধ তৈরিতে সহায়তা করে। 

poem

কয়েক বছর ধরেই বাস্তবতার গ্যারাকলে পড়ে আমি যেভাবে পিষ্ট, তাতে কবিতার বই প্রকাশ করার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হয়েছে। বাস্তবতা কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, তা আমার পরম এক বন্ধু ও কবির উদাহরণ থেকে নিজেকে বিচার করতে পারি। বন্ধুর হঠাৎ করে চাকরি চলে গেল। তাও চার বছর হতে চলল। কিন্তু সে হেরে যাবার পাত্র নয়। প্রায় সবাইকে হুশিয়ার দিয়েই বলে, আছি জীবনের সঙ্গেই আছি, এই অমোঘ মন্ত্রে মনে হয় সমস্ত পরাজয় থেকে বিজয়ী হওয়ার সত্য গভীরভাবে নিহিত আছে। তার নিয়মিত কবিতার বই বের হওয়ার রেকর্ড ছিল, তা ব্যহত হয়েছে, তবে সাময়িক বলে একটি কথা আছে, সেটাও সে ইতিমধ্যে অতিক্রম করে ফেলেছ, এবার মুহুর্মুহু চলবে তার বিজয়রথের চাকা....আমি আশা করি আমার চাকাও যেন সেভাবে চলতে থাকে.... বর্তমানে কবিতারাজ্যে বহু রাজা বাদশা আছে, তাদের রাজা বাদশাগিরি তারা তাদের মতো চালাবে, এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু কবিতা নিয়ে আমার কাজটি আমার মতোও করার শক্তি থাকবে না, হেরে মাঠের পাশে গিয়ে বসে বসে খেলা দেখবো, এটাই বা কি করে হয়....

অদ্যবধি কবিতা লেখার কাজে ক্ষান্ত হওয়ার কোনও ব্যাপরই ঘটেনি আমার বেলায়। দুটি কবিতার বইয়ের পান্ডুলিপির একটির কাজ শেষ হয়ে আসার পথে, বাকিটিতে খুটুনি কম যাবে তা ধারনা করি। ভাত-কাপড় যোগারের চেষ্টা ব্যতিরেকে আমার আর কোনও কাজ নেই, শুধু কবিতার পেছনে সময় দেওয়া ছাড়া....

দৈনিক সরোবর/এএস