add

ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

উৎপাদন বাড়লেও ভোক্তার ক্ষতি

সরকার ধরে রাখতে পারছে না মূল্যস্ফীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: মে ১৫, ২০২৪, ০৭:৫০ বিকাল  

দেশে ডলার সংকট, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি আর ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থার মধ্যেই চলছে আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট তৈরির কাজ। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ৬ জুন জাতীয় সংসদে প্রথমবারের মতো বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। আগামী অর্থবছরের বাজেটে অন্যতম অগ্রাধিকার পাচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। উচ্চমূল্যের বাজারে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে বেঁধে রাখতে চান অর্থমন্ত্রী। তবে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা খুবই সন্দিহান। তারা বলছেন, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি হচ্ছে দেশে। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে মূল্যস্ফীতিকে ধরে রাখতে পারছে না সরকার। সার্বিক দিক পর্যালোচনা করে অর্থবছরের মাঝামাঝি এসে মূল্যস্ফীতির হার বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ নির্ধারণ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থবছরের শুরুতে এ হার ৫ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে রাখার ঘোষণা দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। শেষ পর্যন্ত ওই ঘোষণার মধ্যে রাখা যাচ্ছে না। সংশোধিত মূল্যস্ফীতির হার দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। 

দেশের খাদ্য উৎপাদন এপ্রিল মাসেই রেকর্ড ছাড়িয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও ভোক্তার লাভের চেয়ে ক্ষতির অঙ্কই বেশি। এপ্রিল মাসে গড় মূল্যস্ফীতি মার্চের তুলনায় কিছুটা কমলেও; খাদ্য মূল্যস্ফীতি ফের ২ অঙ্ক ছাড়িয়ে ১০ দশমিক ২২ শতাংশে ঠেকেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়েছে। এটি সমন্বয় করতে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ানো হয়। এর ফলে পণ্য ও সেবা খাতের ব্যয় বেড়ে গেছে। যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিয়েছে। মূল্যস্ফীতির হার কাগজ-পত্রে নিয়ন্ত্রণমূলক ধরা হলেও বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। ফলে মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণ শুধু কাগজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

জানা গেছে, প্রতি বছর সাধারণত বাজেটের আকার ১২-১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে চলতি বছরের তুলনায় আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৫-৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও বাজেট ঘাটতিকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে রাখতে বিশেষ নজর থাকবে যেন সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা যায়। এছাড়া সবার জন্য খাদ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি অর্জন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি, প্রতিটি গ্রামের আধুনিকায়ন, ডিজিটাল স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, ফাস্ট ট্র্যাক অবকাঠামো প্রকল্পে গুরুত্বারোপ, জলবায়ু অভিঘাত ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়গুলোও প্রাধান্য পাবে। এছাড়া সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে। পণ্যের বাজার মনিটরিং, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বৃদ্ধি করা এবং জ্বালানি তেলের মূল্য বিশ্ববাজারের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয়করণের ব্যবস্থা বাস্তবায়ন হচ্ছে। এসব বিষয় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছে অর্থ বিভাগ।

খাদ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ১০.২২ শতাংশ; জুনের মধ্যে ৮% নামিয়ে আনা নিয়ে রয়েছে সংশয় 

এদিকে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন সেটি করতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক- এমনটা মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে অদক্ষতা কিংবা ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থনীতিবিদগণের শঙ্কা- আগামীতে মূল্যস্ফীতির হার আরও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। কারণ ডলারের মূল্য একলাফে ৭ টাকা বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতিতে চাপ থেকেই যাচ্ছে। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের জুনের মধ্যে সরকারের সংশোধিত মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৮ শতাংশে নামিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতি কমানোর কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু কী করলে সেটি কমবে; সেভাবে নীতি গ্রহণ করলে বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে। ফিসক্যাল পলিসিতে মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য কী পরিবর্তন হবে, বাজেট ঘাটতি কমানোর কী উদ্যোগ থাকছে সেটি বলতে হবে। এছাড়া টাকা ছাপিয়ে অর্থায়ন এবং ঘাটতি বাজেট পূরণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশেষ বন্ড ইস্যু করে টাকা না নেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত আসলে বুঝতে সুবিধা হবে যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে প্রাক্কলন করা হয়েছে সেদিকে যাবে কিনা। এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে দেখতে হবে সরকারের সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা রূপরেখার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।

বিশেষজ্ঞরা জানান, আগামীতে মূল্যস্ফীতির হার আরও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। কারণ ডলারের ঊর্ধ্বগতির কারণে মূল্যস্ফীতিতে চাপ থেকেই যাচ্ছে। টাকার মান অবমূল্যায়ন করে মূল্যস্ফীতি কোনোভাবেই সাড়ে ৬ শতাংশের মধ্যে রাখা সম্ভব নয়। এটি করতে পারলে সরকারকে স্বাগত জানাবেন বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে সরকার। রিজার্ভ নিচের দিকে নামছে। এটি সরকারের ভুল নীতির কারণে হয়েছে। তার ধারণা, আগামীতে দেশের অর্থনীতিতে চলমান অস্থিরতা বজায় থাকবে।

এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমদানি বেড়ে যাওয়ায় ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঘাটতি বেড়েছে। এটি স্থিতিশীল না করা গেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না। এখন মূল্যস্ফীতি বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমেরিকায় ৪৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যান্য দেশে দুই থেকে তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিরাজ করছে মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশে এটি সহনীয় পর্যায়ে আছে তা দেখানোর চেষ্টা চলছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ে সরকারের যে তথ্য তার সঙ্গে বাস্তবতার তফাত আছে। মূল্যস্ফীতি বাড়লে ধনীকে আরও ধনী করবে। এছাড়া সরকারের কিছু নীতি পরিবর্তন করতে হবে। ব্যাংকের সঞ্চয় সুদহার ৬ থেকে ৭ শতাংশ করতে হবে। তখন শিল্প ঋণের সুদ হার ডাবল ডিজিটে চলে যাবে। তা শিল্প খাতকে ধ্বংস করে দেবে।

আগামী অর্থবছরে বাজেটের আকার প্রাক্কলন করা হয়েছে ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। আর রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৫ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে ২ লাখ ৫৭ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বাজেট ঘাটতি মেটানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ১ লাখ কোটি টাকার বিদেশি ঋণ পাওয়া যাবে বলে আশা করছে সরকার। বাকি ১ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা দেশের ব্যাংকিং খাতসহ অন্যান্য উৎস থেকে ঋণ নেয়া হবে। সূত্র জানিয়েছে, উচ্চ সুদের কারণে আগামী অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ না নিয়ে এ খাতের পুরনো ঋণ পরিশোধ করবে সরকার। কিন্তু সঞ্চয়পত্রের চেয়েও বেশি সুদবাহী হওয়া সত্ত্বে¡ও সরকারি চাকরিজীবীদের বিনিয়োগের মাধ্যম জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ড (জিপিএফ) থেকে ঋণের পরিমাণ বাড়াবে সরকার। একই সঙ্গে ব্যাংক খাত থেকে চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

দৈনিক সরোবর/কেএমএএ