add

ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১

মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি

সব শিল্পেরই উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে

এসএম শামসুজ্জোহা 

 প্রকাশিত: জুন ১০, ২০২৪, ০৬:৩৯ বিকাল  

দেশে বৈদেশিক মুদ্রায় অস্বস্তি এখনো কাটেনি। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় সার্বিক বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাব, আর্থিক হিসাব, এমনকি সার্বিক স্থিতিতেও ঘাটতি হচ্ছে। ফলে রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে ডলারের দাম। বাড়ছে ডলারের ঘাটতিও। এসব কারণে ডলারের বাজারে অস্বস্তি রয়েই যাচ্ছে।

ডলারের বাজারে শৃঙ্খলা ফেরেনি। নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও ডলারের বাজারে সরবরাহও খুব একটা বাড়েনি। ব্যাংকে নির্ধারিত দরে ডলার পাওয়া না গেলেও ব্যাংকের বাইরে বাড়তি দরে ডলার ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে। তাই উচ্চদরে স্থিতিশীল হয়ে আছে ডলার। অনেক দিন ধরে ব্যাংকগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ১২০ থেকে ১২২ টাকায় রেমিট্যান্স কিনছে। আর আমদানিকারকদের কাছে বিক্রি করছে ১২২ থেকে ১২৪ টাকায়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যস্থতায় ব্যাংকগুলোর ডলার কেনার নির্ধারিত দর ১১৭ টাকা ৯০ পয়সা। ফলে খরচ বাড়ছে আমদানি পণ্যের। এর প্রভাব পড়ছে ভোগ্যপণ্যের দামে এবং ভোক্তাদের বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে।

জানা গেছে, দেশে দুই বছরের বেশি সময় ধরে ডলার সংকট চলছে। সংকটের কারণে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় এলসি খুলতে পারছেন না। ফলে সার্বিক আমদানিসহ শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি, মধ্যবর্তী পণ্য ও কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলা কমছে। এমন পরিস্থিতিতে সব শিল্পেরই উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বেসরকারি বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে। এতে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আমদানি বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের দাম বাড়ছে। এ জন্য রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বাড়াতে বড় উদ্যোগ নিতে হবে। আর খোলাবাজারে সংকট কাটাতে কেউ যাতে সীমার বেশি নগদ ডলার বিদেশে নিতে না পারে; তার তদারকি জোরদার করতে হবে। 

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সবখানে একটা জবাবদিহিতার বিষয় থাকা জরুরি। শক্ত জবাবদিহিতা ছাড়া কোথাও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়।

তথ্য মতে, গত মে মাসে রপ্তানি আয় কিছুটা বাড়লেও রেমিট্যান্স অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে গত অর্থবছরের জুন-মের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময় পর্যন্ত রেমিট্যান্স কমেছে ১৭ দশমিক ১৮ শতাংশ। একই সময়ে রপ্তানি আয় ৭ দশমিক ১১ শতাংশ বাড়লেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম।

খোলাবাজারে ১২৫ টাকার কমে মিলছে না ডলার। এর প্রভাব পড়ছে উৎপাদন ও বিনিয়োগে

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখনো ১৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। আগামী বছর থেকে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ দুই গুণের বেশি বাড়বে। ফলে সামনের দিনগুলোতে ডলারের চাহিদা কখনই কমবে না। এ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সরবরাহ বাড়াতে না পারলে সংকট আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে না পারলে এ সংকট উত্তরণ সম্ভব নয়। অন্যদিকে ডলারের সঙ্গে ইউরোসহ অন্য বৈদেশিক মুদ্রার দামও বাড়ছে অব্যাহতভাবে।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, একেক জায়গায় একেক রেট কার্যকর রেখে বাজারটাকে কখনোই স্বাভাবিক রাখা যাবে না। এ কারণে সবার জন্য একক রেট কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে ডলার পাচার রোধ করতে হবে। এছাড়া রপ্তানি আয়ের একটা মোটা অঙ্ক দেশে আসছে না। এটা সবার কাছে পরিষ্কার। এ তথ্যটা সরকার জানে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকও জানে। ফলে ওই ডলারটা কেন আসছে না; কারা আনছে না তাদের ধরতে হবে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, গত অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ হাজার ২৪৩ কোটি ডলার। এর বিপরীতে আয় হয়েছে ৫ হাজার ৫৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় কম হয়েছে ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময় আয় হয়েছিল ৪ হাজার ৭১৭ কোটি ডলার। সেক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ৭ দশমিক ১১ শতাংশ। প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, একক মাস হিসাবে এপ্রিলে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়নি। তবে গত বছর একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। মে মাসে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫১২ কোটি ডলার। আয় হয়েছে ৪৮৯ কোটি ডলার। আয় কম হয়েছে ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ। গত বছর একই সময় আয় হয়েছে ৩৮৩ কোটি ডলার। সেক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ২৬ দশমিক ৬১ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক ঝুঁঁকি সামাল দিতে সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র হলো বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ। ডলার সংকটের কারণে সেই রিজার্ভ কমে যাওয়ায় অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে। অর্থনীতির এই সংকট কাটাতে হলে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। এ জন্য বৈদেশিক মুদ্রাবাজার আরেকটু উদার করা যেতে পারে। পাশাপাশি বাজেট ব্যবস্থাপনায় আরও সাশ্রয়ী হতে হবে। সেই সঙ্গে রাজস্ব আহরণে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রাজস্ব ও ভ্যাট ফাঁকি বন্ধ করতে হবে। এছাড়া দেশের শিল্প উৎপাদনের বেশির ভাগই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে ডলার সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে আমদানি ও উৎপাদন পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। এতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যাংকার জানান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে ডলারের বিপরীতে টাকার মান এক ধাপে প্রায় ৭ টাকা কমানো হয় গত ৮ মে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে ১১৮ টাকায় প্রতি ডলার বিক্রি হওয়ার কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্য ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইটেও ডলারের সর্বোচ্চ দর ১১৮ টাকা দেখানো হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে ব্যাংকগুলোতে এই দরে ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। এলসি খোলার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা এখনো ব্যাংকের ওপর পুরোপুরি নির্ভর হতে পারছেন না। ফলে খোলাবাজারেও ডলারের সংকট কাটছে না; তাই দর এখনো চড়া। এ ব্যাপারে মানি চেঞ্জারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ সভাপতি এম এস জামান জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে সার্কুলার দেয়া হয়েছে তাতে ক্রলিংপেগের ১১৮ টাকা কোন রেট তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। এটি কি আমদানি না রফতানি দর, ক্যাশ কারেন্সি কত হবে তা নির্দিষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। আমরা শুনেছি, কেউ কেউ ১২৫ টাকা দরে ডলার কেনাবেচা করছে। তবে তারা আমাদের কোনো সদস্য নন। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে নির্দেশনা দেবে তাই আমরা মেনে নেবো।

ইপিবির তথ্য মতে, গত অর্থবছরের ১১ মাসে গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ২০৩ কোটি ডলার। আয় হয়েছে ৪ হাজার ২৬৩ কোটি ডলার। আয় বেশি হয়েছে শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ। এছাড়া গত অর্থবছরের একই সময় আয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৫২ কোটি ডলার। সেক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এ বিষয়ে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাফর আলম বলেন, রেমিট্যান্স আরও বাড়ানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। এছাড়া ফ্রিল্যান্সারদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে সুযোগ-সুবিধা কীভাবে বাড়ানো যায়; সে চেষ্টা করতে হবে। ফ্রিল্যান্সিং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটা বড় খাত হতে পারে।

দৈনিক সরোবর/কেএমএএ