add

ঢাকা, রবিবার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১

সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন চাওয়াটাই কাল হয়েছে, দাবি মিন্টুর

সরোবর প্রতিবেদক 

 প্রকাশিত: জুন ১৩, ২০২৪, ০৯:৫৫ রাত  

ভারতে  চিকিৎসা করতে গিয়ে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার অপহরণের পর খুন হন। এমপি আনারকে অপহরণ ও হত্যার পুরো বিষয়টি জানতেন ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু। এ ঘটনায় গ্রেফতারদের জবানবন্দি ও তাদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখে হত্যাকাণ্ডে মিন্টুর সংশ্লিষ্টতার তথ্য মিলেছে।

বৃহস্পতিবার রিমান্ড শুনানিতে এসব কথা বলেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। রিমান্ড শুনানি চলাকালে বিচারক মিন্টুকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কিছু বলবেন?’ মিন্টু তখন বলেন, ‘আমি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। এমপি নির্বাচনে মনোনয়ন চাওয়াটাই আমার অপরাধ।’

এর আগে এদিন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মিন্টুকে হাজির করে পুলিশ। এরপর মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাকে ১০ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন ডিবি পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মাহফুজুর রহমান। তবে তার আইনজীবী রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিনের আবেদন করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তোফাজ্জল হোসেন জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে মিন্টুর আটদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ড আবেদনে তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, গ্রেফতার সাইদুল করিম মিন্টুকে (৬০) আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এছাড়া এমপি আনার অপহরণ মামলার অন্যতম আসামি শিমুল ভুইঁয়া ওরফে শিহাব ওরফে ফজল মোহাম্মদ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তার জবানবন্দিতে আসামি সাইদুল করিম মিন্টুর সংশ্লিষ্টতা বর্ণিত আছে। জবানবন্দিতে ভিকটিমকে প্রলুব্ধ করে অপহরণ তথা হত্যার সঙ্গে আর্থিক লেনদেন বিষয়ে সাইদুল করিম মিন্টুর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। এছাড়া এমপি আনার অপহরণে সাইদুল করিম মিন্টুর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন পুলিশ রিমান্ডে থাকা আসামি কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবু। অপহরণ ও হত্যার প্রমাণ হিসেবে মিন্টুকে এমপি আনারের ছবি পাঠানো হয়। হত্যার জন্য শিমুল ভুইঁয়ার দাবি করা টাকার আংশিক গত ২৩ মে দেওয়ার কথা ছিল মিন্টুর।

মিন্টুর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলেন শাহীন: রিমান্ড আবেদনে তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, আসামি শিমুল ভুইঁয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছেন- চলতি বছরের ৫ বা ৬ মে এমপি আনারকে প্রলুব্ধ করে অপহরণ ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী আক্তারুজ্জামান শাহীন হোয়াটসআ্যাপে কথা বলেন সাইদুল করিম মিন্টুর সঙ্গে। তারা এমপি আনার হত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে কথা বলেন।

হত্যার প্রমাণ দেখাতে পাঠানো হয় ছবিপুলিশ রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার বাবু জানান, এমপি আনারকে হত্যার পর শিমুল ভুইঁয়া টাকা লেনদের বিষয়ে সাইদুল করিম মিন্টুর সঙ্গে ডিজিটালি ও সরাসরি আলোচনা করেন। অপহরণ ও হত্যার প্রমাণ হিসেবে মিন্টুকে এমপি আনারের ছবি পাঠানো হয়। হত্যার জন্য শিমুল ভুইঁয়ার দাবি করা টাকার আংশিক গত ২৩ মে দেওয়ার কথা ছিল মিন্টুর।

বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন মিন্টু: প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার মিন্টুর কাছে জানতে চাওয়া হয়, এমপি আনার অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত আছে কি না? তবে এ ব্যাপারে মিন্টু সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন। মামলার ঘটনার সঙ্গে মিন্টুর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি একেক সময় একেক তথ্য দেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর তিনি কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

গত মঙ্গলবার বিকেলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাজধানীর ধানমন্ডি থেকে মিন্টুকে আটক করে ডিবি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে এমপি আনার হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। এর আগে গত ২৩ মে সৈয়দ আমানুল্লাহ আমান ওরফে শিমুল ভূঁইয়া, ফয়সাল আলী সাজী ওরফে তানভীর ভূঁইয়া ও সিলিস্তি রহমানকে এমপি আনার অপহরণ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। পরে দুই দফায় তাদের ১৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। তিনজনই ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। বর্তমানে তারা কারাগারে রয়েছেন।

গত ১২ মে চিকিৎসার জন্য ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থেকে ভারতে যান এমপি আনার। ওঠেন পশ্চিমবঙ্গে বরাহনগর থানার মণ্ডলপাড়া লেনে গোপাল বিশ্বাস নামে এক বন্ধুর বাড়িতে। পরদিন চিকিৎসক দেখানোর কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। এরপর থেকেই রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন আনোয়ারুল আজীম আনার।

বাড়ি থেকে বেরোনোর পাঁচদিন পর ১৮ মে বরাহনগর থানায় আনোয়ারুল আজীম নিখোঁজের বিষয়ে জিডি করেন বন্ধু গোপাল বিশ্বাস। এরপরও খোঁজ মেলে না তিনবারের এই সংসদ সদস্যের। ২২ মে হঠাৎ খবর ছড়ায়, কলকাতার পার্শ্ববর্তী নিউটাউন এলাকায় সঞ্জীবা গার্ডেনস নামে এক আবাসিক ভবনের বিইউ ৫৬ নম্বর রুমে আনোয়ারুল আজীম আনার খুন হয়েছেন। ঘরের ভেতর পাওয়া গেছে রক্তের ছাপ। তবে ঘরে মেলেনি মরদেহ।

মামলার ঘটনার সঙ্গে মিন্টুর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি একেক সময় একেক তথ্য দেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর তিনি কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

এ ঘটনায় ২২ মে ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন তার মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন। মামলাটি অপহরণ মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়।

মামলার এজাহারে এমপির মেয়ে উল্লেখ করেন, ৯ মে রাত ৮টার দিকে আমার বাবা মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের সংসদ সদস্য ভবনের বাসা থেকে গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। ১১ মে ৪টা ৪৫ মিনিটে বাবার সঙ্গে মোবাইলে ভিডিও কলে কথা বললে বাবার কথাবার্তায় কিছুটা অসংলগ্ন মনে হয়। এরপর বাবার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও বন্ধ পাই। ১৩ মে আমার বাবার ভারতীয় নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি মেসেজ আসে। মেসেজে লেখা ছিল ‘আমি হঠাৎ করে দিল্লি যাচ্ছি, আমার সঙ্গে ভিআইপি আছে। আমাকে ফোন দেওয়ার দরকার নেই। পরে ফোন দেবো’।

এজাহারে আরো উল্লেখ করা হয়, আমরা বিভিন্ন জায়গায় বাবার খোঁজখবর করতে থাকি। কোনো সন্ধান না পেয়ে বাবার বন্ধু গোপাল বিশ্বাস কলকাতার বরাহনগর পুলিশ স্টেশনে সাধারণ ডায়েরি করেন। বাবাকে খোঁজাখুঁজি অব্যাহত রাখি। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানতে পারি অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে বাবাকে অপহরণ করে। বাবাকে সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও পাইনি।

দৈনিক সরোবর/এএল