add

ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

হুমকির মুখে পড়তে পারে বাইডেনের পুনর্নির্বাচন

সরোবর ডেস্ক 

 প্রকাশিত: মে ১৫, ২০২৪, ০৩:১৪ দুপুর  

‘জেনোসাইড জো, গাজায় কত শিশু হত্যা করেছো?’-যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ভার্জিনিয়া রাজ্যে নির্বাচনি প্রচারণা অনুষ্ঠানে ভাষণ দেয়ার সময় ফিলিস্তিনপন্থী এক বিক্ষোভকারী চিৎকার তার ভাষণকে ব্যহত করে। মাত্র কয়েক সেকেন্ড এমনটা হতে দেখা যায়, কারণ সাথে সাথেই দলীয় কর্মীরা প্রেসিডেন্টকে মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার সময় `আরো চার বছর, আরো চার বছর’ স্লোগান দিতে শুরু করে। এতে বিক্ষোভকারীর স্লোগান চাপা পড়ে যায়। এটি ছিল ২৩ জানুয়ারির ঘটনা। যখন বাইডেন, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী হয়েছেন, কিন্তু প্রাইমারি নির্বাচনে তখনও প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডেলিগেট পাননি। তবে ততদিনে, জো বাইডেনের পুনরায় প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হওয়ার পথে গাজায় ইসরায়েল এবং হামাসের যুদ্ধ মোকাবেলা করা একটি কঠিন সমস্যা হিসাবে আবির্ভূত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে একশোরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে যুদ্ধ-বিরোধী বিক্ষোভের জোয়ারে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মি. বাইডেন আগের চেয়ে আরো বেশি বাধার মুখে পড়ছেন বলে মনে হচ্ছে। এই বিক্ষোভে দুই হাজারেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস ইসরায়েলে সশস্ত্র হামলা চালানোর পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে `জেনোসাইড জো’ নামটি ছড়িয়ে পড়ে। হামাসের এই হামলায় ১২শ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয় এবং আরও প্রায় আড়াইশ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যায় তারা, যার ফলে এখন যুদ্ধ চলছে। ২৮ অক্টোবর মধ্যে ডেট্রয়েটে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভে যারা অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এটি বহুল উচ্চারিত একটি স্লোগান হয়ে দাঁড়ায়। যুদ্ধের প্রথম মাসগুলোয়, বাইডেন যখন ইসরায়েল সরকারের প্রতি দৃঢ় সমর্থন দেয়ার কথা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের আরব-মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং বাম-গণতান্ত্রিক ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন এটি স্পষ্ট ছিল না যে গাজায় যুদ্ধ এত দীর্ঘ মাস ধরে চলবে এবং অনেক মানুষ হতাহত হবে।

গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে, এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৩৪ হাজার ফিলিস্তিনি মারা গেছেন। যা তরুণ শিক্ষার্থীদের মাঝে অসন্তোষের ঝড় বইয়ে দিয়েছে যারা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করছে। এই তরুণরা এবং তাদের কাছাকাছি দৃষ্টিভঙ্গির অন্যান্য সংখ্যালঘু যেমন: ল্যাটিনো, এশিয়ান, আফ্রিকান-আমেরিকান, এলজিবিটি সম্প্রদায়ের সদস্যরা মূলত ডেমোক্র্যাট পার্টির ভোটার হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকেন। এদের সমর্থন বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি করতে সক্ষম যা পেলে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারবেন বাইডেন।

'বাইডেনের যুদ্ধ': গত বছরের ৭ অক্টোবরের হামলার পর, মি বাইডেন হামাসের আক্রমণের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগতভাবে ইসরায়েল ভ্রমণ করেন এবং ইরান, লেবাননের হেজবুল্লাহ মিলিশিয়াসহ ওই অঞ্চলে হামাসের অন্যান্য মিত্ররা যেন সংঘাত বাড়াতে না পারে তা সতর্কতা হিসেবে ভূমধ্যসাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেন। ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ধ্বংসযজ্ঞ এবং বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষ হতাহত যে হয়েছে তা নয় বরং নেতানিয়াহু সরকারের কঠোরতার কারণে গাজায় খাদ্য ও মানবিক সাহায্যের প্রবেশও কমে যায়। এর ফলে জাতিসংঘ, এনজিও এবং বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সরকার কঠোর সমালোচনা করলেও বাইডেন তখন থেকেই ইসরায়েলের প্রতি তার সমর্থনে অবিচল আছেন - অন্তত জনসমক্ষে। ফিলিস্তিনিপন্থী গোষ্ঠীগুলি একটি সুনির্দিষ্ট যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও, বাইডেন সরকার সাময়িক বিরতির সমর্থন করেন, যা ২০২৩ সালের নভেম্বরে হয়েছিল। ওই যুদ্ধবিরতির কারণে গাজায় বড় আকারে সহায়তা প্রবেশ করতে শুরু করে। সেইসাথে একশ ইসরায়েলি জিম্মি এবং সেখানে বন্দি প্রায় ২৪০ জন ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেয়া হয়।

একই সময়ে, গাজায় আরও মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার জন্য ইসরায়েলের কাছে বাইডেন প্রশাসন বারবার অনুরোধ জানায়। কিন্তু ইসরায়েলের কাছ থেকে কোনো অনুকূল বা বাস্তবসম্মত সাড়া পাওয়া যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র বিমান থেকে ত্রাণ সহায়তা দেয়ার অভিযান শুরু করে। উপত্যকার উপর দিয়ে সরাসরি সাহায্য সরবরাহের জন্য উপকূলে একটি ভাসমান ডক তৈরি করা শুরু হয়।

হোয়াইট হাউসও গাজায় এতো পরিমাণ বেসামরিক মৃত্যুর ঘটনায় বারবার বিরক্তি প্রকাশ করে। এপ্রিলের শুরুতে, প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আসে যে বাইডেন নেতানিয়াহুকে বলেছেন, `মানবিক পরিস্থিতি অগ্রহণযোগ্য এবং `বেসামরিকদের ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক দুর্ভোগ মোকাবেলা করতে সেইসাথে গাজায় নিয়োজিত দাতব্য কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র তাদের গাজা সম্পর্কিত মার্কিন নীতিতে সুনির্দিষ্ট, বাস্তবসম্মত এবং পরিমাপযোগ্য পদক্ষেপ নির্ধারণ করতে যাচ্ছে। তবে একই সময়েও, হোয়াইট হাউস ইসরায়েলে অস্ত্রের চালান বজায় রেখেছে এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তার ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করেছে যাতে ইসরায়েলকে তাদের বিরুদ্ধে আসা প্রস্তাবগুলো থেকে রক্ষা করা যায়। এই পদক্ষেপগুলো ফিলিস্তিনপন্থী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের তীব্রে আপত্তির মুখে পড়ে। জেরেমি কোনিন্ডিক, যিনি বাইডেন এবং বারাক ওবামা সরকারের হয়ে কাজ করেছেন এবং এখন এনজিও রিফিউজিস ইন্টারন্যাশনালের সভাপতিত্ব করছেন, তার ধারণা বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই যুদ্ধকে নিজের করে তুলেছেন।

নিউ ইয়র্ক টাইমসকে কোনিন্ডিক বলেছেন, তারা এমন সব সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে যাতে যুদ্ধ টিকে আছে। এই যুদ্ধ টিকিয়ে রাখতে তারা রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছে। তারা জাতিসংঘে কূটনৈতিকভাবে ইসরায়েলের পাশে থেকেছে যা যুদ্ধকে টিকিয়ে রেখেছে। বাইডেন কি এই যুদ্ধ চাইবেন? না। কিন্তু বাইডেন কি এই যুদ্ধ বস্তুগতভাবে সমর্থন করছেন? হ্যাঁ। এবং তাই সেই অর্থে, এটি তারই যুদ্ধ,।

নির্বাচনি প্রভাব: বাইডেনের গাজা নীতি তার পুনর্নির্বাচনের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করবে এমন আশঙ্কা ওই অঞ্চলে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই রয়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে, মিশিগান ডেমোক্রেটিক কংগ্রেসওম্যান রাশিদা তালাইব এক ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন যাতে তিনি প্রকাশ্যে বাইডেনকে ‘ফিলিস্তিনিদের গণহত্যা’ সমর্থন করার জন্য অভিযুক্ত করেছিলেন। মার্কিন কংগ্রেসে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত একমাত্র প্রতিনিধি তালাইব ভিডিওটিতে বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট, আমেরিকার জনগণ এই বিষয়ে আপনার সাথে নেই। আমরা ২০২৪ সালে সেটা মনে রাখব।

তার বার্তার পরে, স্ক্রিনটি কালো হয়ে যায় এবং একটি বার্তা সামনে আসে যাতে বলা হয়: জো বাইডেন ফিলিস্তিনি জনগণের গণহত্যাকে সমর্থন করেছিলেন। আমেরিকার মানুষ ভুলবে না। বাইডেন, এখন একটি যুদ্ধবিরতি সমর্থন করুন। অথবা ২০২৪ সালে আমাদের উপর নির্ভর করবেন না। এই অস্থিরতা প্রথম রাজনৈতিকভাবে প্রকাশ পায় প্রাইমারির সময় যখন যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠেছিল। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী নির্বাচনে একটি প্রতিনিধিদের অনেকে বাইডেনকে ভোট দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেননি। তথ্যসূত্র: বিবিসি নিউজ বাংলা

দৈনিক সরোবর/এএস