add

ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

উদ্বেগ বাড়ছে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকায়! 

সরোবর ডেস্ক 

 প্রকাশিত: মে ১০, ২০২৪, ০৯:০৪ রাত  

ব্রিটিশ-সুইডিশ কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকা বাজার থেকে সব ধরনের কোভিড ভ্যাকসিন তুলে নিতে শুরু করেছে ৭ মে থেকে। মার্চেই এই টিকা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিল তারা। কোডিভ মহামারি আসার পর থেকে বিশ্বজুড়ে ৩০০ কোটিরও বেশি ডোজ টিকা দেওয়ার পর তারা এই ঘোষণা দেয়। এই খবরে পুরো বিশ্বের মতো উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশেও। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসলেও টিকা গ্রহণকারীদের শরীরে কোনও প্রভাব পড়েছে কিনা বা কতটুকু পেড়েছে এ নিয়ে জরিপ বা গবেষণার ফল পাওয়ার আগে কিছু বলা সম্ভব নয়। 

অ্যাস্ট্রাজেনেকা বলছে, কোভিড-১৯ টিকার নতুন সংস্করণের উদ্বৃত্ত থাকা ও চাহিদা কমে যাওয়ায় তারা টিকা তুলে নেওয়ার এই পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর সঙ্গে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কোনও সম্পর্ক নেই। তবে এর আগে তারা ব্রিটেনের আদালতে এটাও স্বীকার করেছে, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তাদের তৈরি ‘ভ্যাক্সজেভ্রিয়া’ টিকার কারণে রক্ত জমাট বাঁধা ও রক্তচাপ কমে যাওয়ার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। এদিকে তাদের তৈরি কোভিশিল্ড নিয়ে যে মামলা দায়ের করা হয়েছে সেখানে মামলাকারীর দাবি, এই টিকার ডোজ নিয়ে একাধিক মৃত্যু ও গুরুতর অসুস্থতার ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে।

উল্লেখ্য, করোনা প্রতিরোধে অক্সফোর্ড ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা একই টিকা দুই জায়গায় উৎপাদন করে। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে তৈরি টিকার নাম দেয় ‘কোভিশিল্ড’, আর ইউরোপে তৈরি টিকার নাম দেওয়া হয় ‘ভ্যাক্সজেভ্রিয়া’। কোভিশিল্ড টিকা বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই গেছে। ভারতেই এই টিকা দেওয়া হয়েছে অন্তত ১৭৫ কোটি ডোজ। আরো পড়ুন- করোনার টিকা প্রত্যাহার করবে অ্যাস্ট্রাজেনেকা

ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে আদালতের কাছে অ্যাস্ট্রাজেনেকা স্বীকার করেছে, এই টিকা ব্যবহারের কারণে বিরল ক্ষেত্রে থ্রম্বসিস বা থ্রম্বসাইটোপেনিয়া সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ভারতের করুনিয়া নামের এক তরুণী কোভিশিল্ড টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মারা গেছেন—এই অভিযোগ করেছেন তার বাবা বেণুগোপাল গোবিন্দ। ইকোনমিক টাইমসকে তিনি বলেন, সেরাম ইনস্টিটিউট, ভারত সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা সবাই তার মেয়েসহ আরো অনেক মৃত্যুর জন্য দায়ী। থ্রম্বসাইটোপেনিয়া সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়ে ব্রিটেনে ৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এরইমধ্যে টিকা তুলে নেওয়ার খবর আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।

২০২০ সালে যখন করোনা মহামারি সামলাতে পুরো বিশ্ব হিমশিম খাচ্ছিল, তখন বাজারে টিকা নিয়ে আসার ঘোষণা দেয় অ্যাস্ট্রাজেনেকা। টিকাটি ২০২০ সালের ৩০ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যের টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত হয় এবং ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে টিকা দান কার্যক্রম শুরু হয়। বাংলাদেশে পরীক্ষামূলকভাবে ২৬ জনকে এই টিকা দেওয়া হয় একই বছরের ২৭ জানুয়ারি।  কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স রুনু ভেরোনিকা কস্তাকে এক ডোজ ভ্যাকসিন দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা দেয়ার কর্মসূচি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। টিকা দেওয়ার পর এই মানুষগুলোকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। এরপর পুরোদমে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয় ৮ ফেব্রুয়ারি।

বিভিন্ন কোম্পানির টিকা মিলিয়ে মোট ১৫ কোটি ডোজের বেশি করোনা ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে দেশে। টিকা কর্মসূচির জন্য প্রথমে ৭০ লাখ ডোজ ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদিত কোভিশিল্ড টিকা মজুত করা হয়। এর মধ্যে ২০ লাখ ডোজ এসেছে ভারতের শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে। বাকি ৫০ লাখ ডোজ বাংলাদেশে সেরাম ইন্সটিটিউটের কাছ থেকে কিনেছিল। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ৮ মে পর্যন্ত দেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৫ কোটি ৬২ লাখ ৮০ হাজার ৭৬৮ ডোজ অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রথম ডোজ ১৫ কোটি ৯ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ জন, দ্বিতীয় ডোজ ১৪ কোটি ২২ লাখ ৮৬২ জন, তৃতীয় ডোজ ৬ কোটি ৮৬ লাখ ৫ হাজার ৬৭৫ জন এবং চতুর্থ ডোজ ৫১ লাখ ৪৩ হাজার ৬২৯ জন পেয়েছেন সব ধরনের টিকা।

এর মধ্যে অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন ২ কোটি ৭ লাখ ৬৯ হাজার ৪৬৭ জন। আর দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ১ কোটি ৯৫ লাখ ৫ হাজার ৭৬৭, তৃতীয় ডোজ নিয়েছেন ১ কোটি ৬০ লাখ ৪ হাজার ১৯৩ জন এবং চতুর্থ ডোজ নিয়েছেন ১ হাজার ৩৪১ জন। কোভিশিল্ড ভ্যাকসিনটি ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত ছিল। ভ্যাকসিনটি সামগ্রিকভাবে নিরাপদ এবং কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছিল। তবে বলা হচ্ছে, এটি একটি বিরল তবে গুরুতর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বহন করেছিল, যা থ্রোম্বোসাইটোপেনিয়া বা টিটিএস থ্রোম্বোসিস নামে পরিচিত। টিকা দেওয়া প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় দুই থেকে তিন জনের মধ্যে বিরল এই রোগ দেখা দিতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন জানিয়েছেন, অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে দেশে অনুসন্ধান করছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এখন পর্যন্ত কোনও উপসর্গ পাওয়া যায়নি। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ তৎপর রয়েছে। ৮ মে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে টিকাদান কর্মসূচি’কে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আয়োজিত সভায় ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, সম্প্রতি সারা বিশ্বে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার পার্শ প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ায় টিকা প্রত্যাহার করেছে অ্যাস্ট্রাজেনেকা।  তিনি বলেন, আমি এটা জানার পরে ইতোমধ্যেই ডিজি হেলথকে নির্দেশনা দিয়েছি এবং তারা এটা জরিপ করছে। মানে যাদের এই টিকা দেওয়া হয়েছে তাদের ওপর জরিপ করে আমাকে রিপোর্ট দেবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা নিয়ে কিছুটা হলেও উদ্বেগ আছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, কিছুটা উদ্বেগ তো আছে। যুক্তরাষ্ট্রে কিছু মানুষের টিটিএস নামক রোগের উপসর্গ পাওয়া গিয়েছে। মারা যাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। এই টিকা বাংলাদেশে অনেক মানুষ নিয়েছে। যদিও এটি একটি বিরল রোগ। অনেক বেশি উদ্বিঘ্ন হওয়ার কিছু নেই। আমাদের এই বিষয়টিকে দেখতে হবে যে বাস্তবে বাংলাদেশের এই রোগ কতজনের হতে পারে। এটা নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার।

তিনি আরো বলেন, গবেষণা করলে বোঝা যাবে যে কতজনের হতে পারে বা হয়ে থাকতে পারে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সেখানে তো বেশিরভাগ লোক অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা নিয়েছে। সুতরাং তাদের ওখানে কেমন পরিস্থিতি সেটিও বুঝতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হয়তো আমাদের মিলবে না। কারণ তাদের জনগোষ্ঠীর শারীরিক বৈশিষ্ট্য আমাদের থেকে আলাদা। ভারতের সঙ্গে যেহেতু আমাদের জনগোষ্ঠীর মিল আছে সেহেতু আমাদের সেদিকে দেখতে হবে।

দৈনিক সরোবর/এএস