add

ঢাকা, বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

বিশ্ববিদ্যালয়ের করের টাকা শিক্ষার্থীদের ঘাড়েই

সরোবর প্রতিবেদক 

 প্রকাশিত: এপ্রিল ০৮, ২০২৪, ০৯:১৪ রাত  

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের ওপর ধার্য করা কর কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা যাবে না—আদালতের এমন নির্দেশনা রয়েছে। তবে এই নির্দেশের পরও শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত খরচের বোঝা বাড়িয়ে এই করের অঙ্ক সমন্বয় করা হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ১৫ শতাংশ করের এই অতিরিক্ত খরচ সমন্বয় করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থীদের ফি বাড়িয়ে দেবে, অথবা হিডেন চার্জ আদায় করবে। এতে শিক্ষার্থীদের খরচের সূচক আরও বাড়বে। বিশ্লেষকরা আরো বলছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নতুন করে করের বোঝা মানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাড়তি খরচ। সেটার চাপ শিক্ষার্থীদের ওপরই এসে পড়বে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিরাও বলছেন, ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রভাব স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পড়বে শিক্ষার্থীদের ওপর। বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর স্বাভাবিকভাবেই এর চাপ পড়বে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের ওপর কর বসানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর পরিশোধ করতে বেনামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় করতে পারে।

তিনি দাবি আরও করেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এর ওপর কোনও কর আরোপ হয় না। ফলে নতুন করে কর আরোপ হলে কোনও না কোনোভাবে তা শিক্ষার্থীদের ওপরই পড়বে। যারা উদ্যোক্তা তারা একবার টাকা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে দেয়। এরপর পুরোটা চলে শিক্ষার্থীদের বেতনের টাকায়। ফলে এখন নতুন করে যে কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা চালু করলো সরকার, তার চাপ শিক্ষার্থীদের বহন করা ছাড়া উপায় নেই।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি মনে করে, অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আয়ের বড় অংশ লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করে। তাই করারোপের ফলে মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।

শেখ কবির হোসেনের মতে, যদি সরকারকে কর নিতেই হয় তাহলে বিদেশের মতো পদ্ধতি চালু করতে হবে। যেমন, ট্রাস্টি ও বাণিজ্যিক। তখন যার ইচ্ছা সে ট্রাস্টির মাধ্যমে চলবে, যার ইচ্ছা সে বাণিজ্যিক পদ্ধতিতে চলবে। বাণিজ্যিক পদ্ধতিতে চালানো বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা কর দেবেন। নীতিমালাও ওইভাবে সরকার করে দেবে।
শিক্ষার্থীদেরও আশঙ্কা, নতুন এই কর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নিজেদের আয় থেকে দেওয়ার কথা বলা হলেও উন্নয়ন ফি বা বেনামি কোনও খাত দেখিয়ে তা আদায় করতে শিক্ষার্থীদের ওপর ফি বাড়ানো হবে।

এ প্রসঙ্গে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রায়হান বলেন, এমনিতেই সব কিছুতে খরচ বেড়েছে। এখন আশঙ্কা করছি বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ আরও বেড়ে যাবে। কারণ ভার্সিটি কর্তৃপক্ষ এই কর নিজেরা দেবে না। আগেও যেকোনও ধরনের খরচ ছাত্রছাত্রীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

রায়হানের মতো আরিজ হাসানের শঙ্কা, অচিরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি বেড়ে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ বেড়ে যাওয়ার এই আশঙ্কা শুধু রায়হান বা আরিজ হাসানের নয়, লাখ লাখ শিক্ষার্থীর।

ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের সাবেক শিক্ষার্থী সাদ্দিফ অভি বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর করের চাপ শেষমেশ ছাত্রছাত্রীদের ঘাড়েই চাপবে। কোনও কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন ফি বা অন্য নামে বাড়তি টাকা এমনিতেই নেওয়া হয়। এবার সেটা আরও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

বেশ কয়েকজন ছাত্রছাত্রীর অভিভাবকের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, সরকারের এই ১৫ শতাংশ করকে কেন্দ্র করে সন্তানদের শিক্ষায় খরচ বেড়ে যাবে বলে শঙ্কা তাদের। এতে রীতিমতো উদ্বিগ্ন অনেক অভিভাবক।

১৫ শতাংশ করের চাপ শিক্ষার্থীদের ওপরই পড়বে বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নানও। তিনি বলেন, ‘ছাত্রছাত্রীদের ওপর চাপটা বাড়বে। এই করারোপের কারণে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিকভাবে সচ্ছল না, সেসব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধও হয়ে যেতে পারে।’

খোদ এনবিআরের কর্মকর্তারাও মনে করেন, সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষার্থীদের খরচ বেড়ে যাবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, আয়ের ওপর কর আরোপ হলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই খরচ সমন্বয় করতে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ তৈরি করবে।’ আদালতের নির্দেশনা সবাইকে মানতে হবে উল্লেখ করে এনবিআরের এই কর্মকর্তা বলেন, কর আদায় করার ক্ষেত্রে এনবিআর আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করছে মাত্র।

এনবিআরও মনে করে শিক্ষার ব্যয় বাড়বে

এর আগে ২০১৫ সালে এনবিআরের এক আদেশে বলা হয়, মূল্য সংযোজন কর আরোপ করলে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার ব্যয় অধিকতর বৃদ্ধি পাবে।

ওই সময় সরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট নেওয়ার চেষ্টা করে। তখন সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওই ভ্যাট শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হবে না।

পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে সরকার সিদ্ধান্ত বদলায়। তৎকালীন এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত ওই আদেশে বলা হয়, যেহেতু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় হয় এবং যেহেতু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রদত্ত সেবার ওপর মূল্য সংযোজন কর আরোপ করি, শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার ব্যয় অধিকতর বৃদ্ধি পাবে।

এদিকে গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি আপিল নিষ্পত্তি করে দেওয়া রায়ে বলা হয়েছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে।

এরপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বকেয়া কর আদায়ে চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্থগিত করেছে। এতে ব্যাংকের লেনদেন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। জব্দ হওয়া ব্যাংক হিসাবের তালিকায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির মতো শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামও রয়েছে। এতে ঈদের আগে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন ও বোনাসের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

এদিকে বিদ্যমান ট্রাস্ট আইন-১৮৮২ অনুযায়ী, ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত অলাভজনক প্রতিষ্ঠান করযোগ্য নয়। এখন করের আওতায় আনার ফলে শিক্ষা খাত ব্যবসা খাতভুক্ত হয়ে যায় বলে মনে করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনেকে।

প্রসঙ্গত, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০’-এর আওতাধীন। এই আইনে ট্রাস্টের অধীনে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই সেগুলো পরিচালিত হয়ে থাকে।

দৈনিক সরোবর/বি কে