ঢাকা, শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯

টানেল যুগে বাংলাদেশ

সম্পাদকের কলম

 প্রকাশিত: নভেম্বর ২৭, ২০২২, ১২:১৪ রাত  

ফাইল ফটো

মানুষের জীবন বদলে দিতে উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। যেসব দেশ উন্নতির সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেতে পেরেছে, ওইসব দেশের মানুষ উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ পেয়েছে। একসময় আমাদেরকে ভুখা-নাঙ্গা বাঙালি বলে উপহাস, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য শুনতে হয়েছে। এখন আর কেউ এভাবে বলে না। বর্তমান বিশ্বে বাঙালি আত্মমর্যাদায় বলিয়ান হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছে।

উন্নতির রোল মডেল হিসেবে ভূষিত করা হয় বাংলাদেশকে। অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বর্তমান জায়গায় এনেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, দেশের এক শ্রেণির মানুষ, দেশের এই উন্নয়ন নিয়ে উপহাস-তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন। এরা যে আসলে বাংলাদেশ নিয়ে গর্ববোধ করে না। মনে হয় বাংলাদেশের উন্নতি-সমৃদ্ধি-অগ্রগতি তাদের চক্ষুশূল।

কেন তাদের মনে এ অবস্থা? তারা কি চান, বাঙালি জাতি চিরকাল গরিব থাকুক, ভুখা-নাঙ্গা থাকুক। তাদের কথাবার্তা সেটাই যেন মনে হয়। তারা নিজেরা বিত্ত-বৈভবে ডুবে থাকার অধিকার রাখেন, কিন্তু দেশের মানুষ তথা সাধারণ মানুষ একটু সুখের ছোঁয়া পাক, অর্থনৈতিক মুক্তি ও সচ্ছলতা আসুক তাদের জীবনে, এটা তারা চান না এবং সহ্যও করতে পারেন না। তাই দেখা যায়, গণতন্ত্রের মানসকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের যেসব উন্নতি করছেন, তা নিয়ে সারাক্ষণ ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ-এবং উন্নাসিকভাবে কথাবার্তা বলতে লজ্জা পান না।

মনে হতে পারে, দেশের উন্নয়নের কোনো প্রয়োজন ছিলো না। একটা কথাই ধরা যাক, রিজার্ভ থেকে টাকা নিয়ে পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দরের বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প সরকার বাস্তবায়ন করছে। প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকায় এগুলো করা হচ্ছে। কিন্তু এক শ্রেণির ব্যক্তি, যাদের গায়ে রাজনীতিবিদ হিসেবে তকমা লাগানো। তারা সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে রিজার্ভের টাকায় কেন পায়রার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরকারকে তুলোধুনো করে ছেড়েছে। এসব ব্যক্তির ব্যাপারে বলা যায়, এরা দেশের ক্ষতি হয় এমন বক্তব্য থেকে নিজেদের বিরত রাখবেন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধারাবাহিকভাবে দেশের যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নতি করে যাচ্ছেন। মানুষ আগে ভাবতেই পারতো না, এভাবে উন্নয়ন সম্ভব। কিন্তু অসম্ভবকে সম্ভব করার কারিশমা জানেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে প্রথম নির্মিত হচ্ছে কর্ণফুলী বঙ্গবন্ধু টানেল। এটি স্বল্প সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে আনা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে আগামী বছরের জানুয়ারিতে গাড়ি চলাচল করবে।

মেগা প্রকল্পের একটি এই টানেল। এতে দেশের যোগাযোগ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। দেশের প্রথম টানেল হওয়ায় সবারই একটি কৌতূহল আছে এ নিয়ে। উন্নত দেশগুলোতে অনেক আগে টানেল তৈরি করে যোগাযোগ অবকাঠামোর ভিন্নমাত্রা দেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে অর্থের সাশ্রয় হয়, অন্যদিকে সুবিধাও বয়ে আনে। হয়তো এটাই অনুকরণে দ্বিতীয় পদ্মাসেতু হতে পারে টানেল নির্মাণ।

টানেল হলে নদীর গতি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় না। এ কারণে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণ করায় নদীর গতি বাধা পাবে না। বর্তমান সরকার যোগাযোগ অবকাঠামোর যে ব্যাপক উন্নতি করেছে; তা, দেশের এক শ্রেণি তকমাধারী রাজনৈতিক ব্যক্তি পাত্তাই দিতে চান না। তারা নিজেরা যখন ক্ষমতায় ছিলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ নানা ক্ষেত্রে কিছুই করতে পারেননি বলা চলে। অথচ তারা বর্তমান সরকারের উন্নয়নের বিরোধিতা ছাড়া যেন আর কিছু শেখেননি। কিভাবে এর গালমন্দ করা যায়। ভাষার সঙ্গে বিষ মিশিয়ে সরকারের উন্নয়নের সমালোচনা করা যায়, সেটিতে বেশ পারঙ্গম। এতে অবশ্য তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু দেশের মানুষ সরকারের যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নতিতে আপ্লুত।

উল্লেখ্য, শনিবার (২৬ নভেম্বর) চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের প্রথম টিউবের (দক্ষিণ) পূর্তকাজ সমাপ্তির উদযাপন অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের উন্নয়ন অনেকের চোখে পড়ে না। তাদের মনে হয় চোখ নষ্ট। যদি চোখ নষ্ট হয়, চোখের ডাক্তার দেখাতে পারে। আমরা খুব ভালো আই ইনস্টিটিউট করে দিয়েছি।

চিকিৎসা করালে আমার মনে হয়, তারা দেখতে পাবে। আর কেউ যদি চোখ থাকতে অন্ধ হয়, তাহলে আমাদের কিছু করার নেই। আমি মনে করি, আমাদের অপজিশন বোধ হয় চোখ থাকতে অন্ধ। তারা দেখেও না দেখার ভান করে। নিজেরা কিছু করতে পারেনি, ভবিষ্যতেও কিছু করতে পারবে না। দেশকে কিছু দিতেও পারবে না। হ্যাঁ, ক্ষমতায় বসে নিজেরা খেতে পারবে, অর্থ চোরাচালান করতে পারবে, ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালানি করতে পারবে, অর্থ-অস্ত্র চোরাচালানি, এতিমের অর্থ আত্মসাৎ; এগুলো পারবে। মানুষের কল্যাণে কাজ করেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। এটা হলো বাস্তবতা।

করোনা মহামারির সময় সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা। উন্নত দেশগুলো হিমশিম খাচ্ছে। এমনকি অনেকে দেশ নিজেদের দেশে অর্থনৈতিক মন্দা ঘোষণাও দিয়েছে। আমরা এখনও সেই দুর্ভাগ্যজনক অবস্থায় পড়িনি। আমাদের যেটুকু আছে নিজেদের সম্পদ আমরা ব্যবহার করার সক্ষমতা রাখি। আমি দেশবাসীকে আহ্বান করেছি, যার যেখানে জমি-জলাধার আছে উৎপাদন বৃদ্ধি করেন। নিজেদের খাদ্য নিজেরা উৎপাদন করবো। কারও কাছে হাত পেতে চলবো না। সেই নীতি নিয়ে সবাইকে চলার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি।

মনে রাখতে হবে একদিকে করোনাভাইরাসের মন্দা, অপরদিকে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞা। তার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিটি জিনিসের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি একটা বিরাট সমস্যা সারা বিশ্বব্যাপী। তার ধাক্কা থেকে আমরাও দূরে না। অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব আমাদের ওপর এসেছে পড়েছে। তারপরও আমরা অর্থনীতির চাকা গতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছি। এটা আমরা রাখতে পারবো যদি দেশবাসী এ বিষয়ে সচেতন হন, নিজেদের সঞ্চয় বাড়ান, মিতব্যয়ী হন। কৃষি জমি রক্ষা করেই শিল্পায়ন যেন হয় আমরা সে পদক্ষেপ আমরা নিয়েছি।

কর্ণফুলী বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণ করে শেখ হাসিনা সরকার পদ্মাসেতুর পরে বড় একটি অর্জন পেল। সরকারের যারা বিরোধী পক্ষ তারা যতই সরকারের উন্নয়নে ভ্রু-কুটি করেন না কেন, তাতে সরকার ও জনগণের কিছু আসে যায় না। বরং সমালোচনাকারীর পায়ের তলার মাটি পুরোপুরিই সরে যায়। 

কর্ণফুলী বঙ্গবন্ধু টানেল তৈরি হচ্ছে চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায়। ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই মেগা প্রকল্প। এখন চলছে টানেলের ভেতরে ফায়ার ফাইটিং, লাইটিং ও কন্ট্রোল ব্যবস্থাপনার কাজ। পরীক্ষামূলক চালানো হচ্ছে প্রকল্পের গাড়িও। নদীর তলদেশে হওয়ায় যেকোনো সময় পানি জমতে পারে আশঙ্কায় টানেলের মধ্যে বসানো হচ্ছে ৫২টি সেচ পাম্প। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, গাড়ি চলাচলের জন্য আগামী বছরের জানুয়ারিতে খুলে দেওয়া হতে পারে এই টানেল। টানেলে নদীর তলদেশে স্থাপন করা হয়েছে দুটি টিউব। একটি টিউবে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যেন বিকল্প পথে গাড়ি চালানো যায়, সেটিরও কাজ চলছে। বাতি ও পাম্প স্থাপন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরির কাজও সমানতালে চলছে। নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ সড়ক, ৭৭২ মিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভার।

এখন চলছে কর্ণফুলীর দক্ষিণ প্রান্তে আনোয়ারা অংশে টোল প্লাজা নির্মাণের কাজ। টানেল চালু হলে চীনের সাংহাই শহরের আদলে ওয়ান সিটি টু টাউন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এক ধাপ এগিয়ে যাবে। টানেলকে ঘিরে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম নগরীর এবং পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সড়ক যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

এরই মধ্যে আনোয়ারা উপজেলা প্রান্তে সংযোগ সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠছে ছোট-বড় অসংখ্য শিল্প-কারখানা। টানেলকে ঘিরে পর্যটন, শিল্পায়নসহ অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে নতুন মাত্রা। টানেল চালু হলে কর্ণফুলী নদী পাড়ি দিতে সময় লাগবে মাত্র ৫ থেকে ৬ মিনিট। সময় বেঁচে যাওয়ায় অর্থনীতি গতি পাবে।

টানেল নির্মাণের আগে ২০১৩ সালে করা সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, টানেল চালুর পর এর ভেতর দিয়ে বছরে ৬৩ লাখ গাড়ি চলাচল করতে পারবে। সেই হিসাবে দিনে চলতে পারবে ১৭ হাজার ২৬০টি গাড়ি। ২০২৫ সাল নাগাদ টানেল দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ২৮ হাজার ৩০৫টি যানবাহন চলাচল করবে, যার মধ্যে অর্ধেক থাকবে পণ্যবাহী যানবাহন।

২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিদিন গড়ে ৩৭ হাজার ৯৪৬টি এবং ২০৬৭ সাল নাগাদ ১ লাখ ৬২ হাজার যানবাহন চলাচলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা আছে। টানেল নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। বাকি ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা দিচ্ছে চীন সরকার। চীনের এক্সিম ব্যাংক ২ শতাংশ হারে ২০ বছর মেয়াদি এ ঋণ দিয়েছে। চীনের কমিউনিকেশন ও কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসি) টানেল নির্মাণের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

পরিশেষে আমরা বলতে চাই, জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু টানেল চালু হলে পূর্বাঞ্চলের মানুষের অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যাত্রা পথে তাদের বহু সময় বেচে যাবে। এ টানেল নিয়ে চট্টগ্রামবাসীর মধ্যে আনন্দের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। এই আনন্দের ঢেউ সারাদেশেও পড়ছে। আগামী মাসে মেট্রোরেল চালু হবে। এতে রাজধানীবাসীর মনেও আনন্দ স্ফুলিং হয়ে জ্বলছে।

দৈনিক সরোবর/এমকে