add

ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

জাল টাকার কারবার

মানুষসহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি

সরোবর প্রতিবেদক  

 প্রকাশিত: মে ১৯, ২০২৪, ০৪:০৭ দুপুর  

ঈদ এলেই জাল নোট কারবারিরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। যখন ঈদের বাজারে বেচাকেনা ও ব্যস্ততা বাড়ে, তখন মোক্ষম সুযোগ হিসেবে বেছে নেয় জাল নোট চক্র। বিভিন্ন বিপণি কেন্দ্রে আসল নোটের সঙ্গে মিশিয়ে জাল নোট চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে তারা। ক্রেতা সামলানোর ব্যস্ততায় এ সময় প্রতিটি নোট যাচাই-বাছাই করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে সহজে জাল নোট কারবারিরা ধরা পড়ে না। এমন পরিস্থিতিতে এসব চক্রের তৎপরতা রুখতে সক্রিয় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও। এরই মাঝে ঢাকায় বিপুল পরিমাণ জাল টাকা ও জাল টাকা তৈরির সরঞ্জামসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন চক্রের সদস্যরা। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে আরও অন্তত এক ডজন কারবারির নাম। ওইসব সদস্যরাও রয়েছেন নজরদারিতে। যে কোনো সময় তাদের গ্রেপ্তার করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বাজারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে জাল টাকার কারবারিরা। এ চক্রের সদস্যরা আসন্ন ঈদের কেনাকাটায় দেশের বিভিন্ন মার্কেট, হাঁটে-ঘাটে সিন্ডিকেট করে জাল টাকা বিতরণ করছে। এক্ষেত্রে এক লাখ টাকার জাল নোট বিক্রি হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকায়। ছড়িয়ে পড়া এসব জাল টাকার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতারা। এতে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে জনমণে।

জানা গেছে, জাল টাকা তৈরির পর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে চক্রের সদস্যরা। প্রিন্টার ও অন্যান্য সরঞ্জামের সহায়তায় বিশেষ ধরনের কাগজে নিখুঁতভাবে জাল টাকা তৈরি করছে চক্রের সদস্যরা। এমনকি আসল টাকায় যে রং পরিবর্তনশীল কালি, অসমতল ছাপা, নিরাপত্তা সুতা ও জলছাপ রয়েছে একইভাবে বিশেষ পদ্ধতিতে জাল টাকায়ও জলছাপ ও নিরাপত্তা সুতার ব্যবহার এবং অনেক ক্ষেত্রে অসমতল ছাপাও দেয়া হচ্ছে। এসব জাল টাকা সহসাই যে কারও পক্ষে চেনা কঠিন। জাল টাকা ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন ধাপে কাজ করে চক্রের সদস্যরা। তারা শুধু টাকাই নয় বিভিন্ন দেশের জাল মুদ্রাও তৈরি করছে। এরা বিভিন্ন সময় জাল টাকা ও তৈরির সরঞ্জামসহ গ্রেপ্তার হলেও জামিনে মুক্তি পেয়ে ফের একই কাজ শুরু করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের লালবাগ জোনের ডিসি (অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মশিউর রহমান বলেন, দেশের কোনো ধরনের উৎসব শুরুর আগে সক্রিয় হয়ে ওঠে জাল টাকার কারবারিরা। এ চক্রের সদস্যদের প্রায়ই গ্রেপ্তার করা হয়। তারপরও তারা জামিনে বেরিয়ে ফের একই অপকর্মে লিপ্ত হয়। চক্রের সদস্যরা তিনভাগে বিভক্ত থাকেন। একটি চক্র টাকা তৈরি করে। অপর চক্রটি পাইকারি হারে টাকা কিনে নিয়ে যায়। সর্বশেষ চক্রের সদস্যরা তা মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দেন। এভাবে হাত ঘুরলেই লাখে ১৫ হাজার করে লাভ করে থাকে চক্রের সদস্যরা। তিনি বলেন, এবার ঈদের আগেও চক্রের সদস্যরা সক্রিয় রয়েছে। এক্ষেত্রে পুলিশও বসে নেই। তাদের শনাক্ত করে গোয়েন্দা জালে নেয়া হয়েছে। যে কোনো সময় তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।

# এক লাখ জাল নোট বিক্রি হয় ১২ হাজার টাকায়। নজরদারিতে এক ডজন কারিগর

এ প্রসঙ্গে র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু জাল নোট প্রস্তুতকারী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। চক্রটি বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে জাল নোট বিক্রির নেটওয়ার্ক তৈরি করে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করছে। চক্রটি কম্পিউটার, প্রিন্টার এবং জাল টাকা তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ করে ঘরে বসে জাল টাকা ছাপানোর কাজ করে থাকে। শুধু তাই নয় চক্রটি বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে জাল টাকা বিক্রির জন্য নেটওয়ার্ক তৈরি করে। তারা এসব পেজ প্রমোট ও বুস্টিং করে অনেক পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা সংগ্রহ করে। এসব চক্রে অনেক নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী রয়েছে। তারা মাদকসহ জাল নোট কারবারের সঙ্গে জড়িত। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, ঈদে মার্কেটগুলো বেচাকেনার জন্য সরগরম হয়ে ওঠে। এ সুযোগে জাল নোটগুলো বিভিন্ন মার্কেটে ছড়িয়ে দেয়া হয়ে থাকে।

ঈদ ছাড়াও অন্য ধর্মাবলম্বীদের উৎসবমুখর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের আগে মার্কেটে কেনাকাটার সময় তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে বিক্রেতাদের এসব জাল মুদ্রা গছিয়ে দেয়া হয়। প্রতিটি উৎসবের আগমুহূর্তে জাল নোট তৈরির চক্রগুলোর জাল টাকা নিখুঁত করার ব্যাপারে প্রতিযোগিতা চলে। কারণ যে চক্রের টাকা যত নিখুঁত, তার টাকার দাম তত বেশি, বিক্রিও বেশি। প্রতি ১০০ পিস ১০০০ টাকার নোট অর্থাৎ এক লাখ টাকা তৈরিতে তাদের খরচ ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা। সেই টাকা তারা পাইকারি বিক্রেতার কাছে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করছে। পাইকারি বিক্রেতা প্রথম খুচরা বিক্রেতার কাছে বিক্রি করে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা, প্রথম খুচরা বিক্রেতা দ্বিতীয় খুচরা বিক্রেতার কাছে বিক্রি করে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় এবং দ্বিতীয় খুচরা বিক্রেতা মাঠপর্যায়ে সেই টাকা আসল এক লাখ টাকায় বিক্রি করছে।

মাঠপর্যায়ে কর্মীরা বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার মাধ্যমে এই জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে থাকে। জাল টাকা তৈরি থেকে শুরু করে বাজারজাত করা পর্যন্ত কয়েকটি ভাগে তারা এ কাজ করে থাকে। প্রথমে অর্ডার অনুযায়ী জাল নোট তৈরি, দ্বিতীয় পর্যায়ে এ টাকাগুলো যে অর্ডার দেয় তার কাছে পৌঁছে দেয়া, তৃতীয় পর্যায়ে জাল টাকা বাজারে ছড়িয়ে দেয়া হয়। সারা বছর মাদকের লেনদেন, চোরাই পণ্যের কারবার, স্বর্ণ বেচাকেনাসহ বিভিন্ন অবৈধ লেনদেনে জাল নোট চালিয়ে দেয় চক্রের সদস্যরা। অন্য পেশায় থাকলেও বেশি লাভের আশায় অনেকে এ পেশায় জড়িয়ে পড়ছে।

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে জাল টাকা প্রতিরোধ টিম রয়েছে। তারা সর্বদা মাঠে সক্রিয় থাকে। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে জাল টাকা কারবারিরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি থাকে। জাল টাকা ও জাল টাকার সরঞ্জামসহ তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। জাল টাকা কারবারিদের প্রতিরোধে এবং কোনোভাবেই যেন জাল টাকা বাজারে ছড়িয়ে না পড়ে সে বিষয়ে পুলিশ সর্বদা তৎপর থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, তারা কেবল জাল টাকা শনাক্ত করতে এবং সেটি হাতে এলে বাতিল করতে পারেন। কারণ তাদের পক্ষে সরাসরি জড়িতদের ধরা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বদা ভূমিকা রাখছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বদা তাদের সহযোগিতা করে থাকেন।

দৈনিক সরোবর/কেএমএএ