add

ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

আর্থিক টানাপড়েনে সরকার

দেনা মেটাতে ছাড়া হচ্ছে বন্ড 

এসএম শামসুজ্জোহা 

 প্রকাশিত: এপ্রিল ০৮, ২০২৪, ০৫:৫৫ বিকাল  

অর্থ সংকটে ভুগছে সরকার। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষ বন্ডের মাধ্যমে টাকা ছাপিয়ে ব্যাংকগুলোকে ঋণ দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে বন্ডের জন্য বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়েছে।  নগদ অর্থের সংকট কাটাতে এখন সরকারের বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে স্পেশাল ট্রেজারি বন্ড। সব মিলিয়ে ভর্তুকির বিপরীতে এ পর্যন্ত ১৬ হাজার ৬৭৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকার বন্ড ইস্যু করেছে সরকার। ব্যাংকের ধারণ করা বিক্রয়যোগ্য বন্ডের পরিমাণ নির্ধারণ শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে হিসাবায়নের বাইরে থাকবে বিশেষ বন্ড। একই সঙ্গে এসব বন্ড ম্যাচিউরিটির পোর্টফলিওর ক্ষেত্রেও বন্ডের পরিমাণ নির্ধারণের হিসাবায়নের বাইরে রাখার সুযোগ দেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, সরকারের কাক্সিক্ষত মাত্রায় আয় বাড়ছে না। যতটুকু হচ্ছে এর মধ্যেই বড় অংশ চলে যাচ্ছে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে। বাকিটা দিয়ে চাকরিজীবীদের বেতন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয় সামাল দিতে ঋণের দিকে ঝুঁঁকছে। কিন্তু নানা কারণে খুব বেশি সাড়া মিলছে না। গেল ছয় মাসে প্রতিশ্রুতির মাত্র ১০ শতাংশ পাওয়া গেছে বিদেশি ঋণ। আবার যেটুকু মিলছে তার বড় একটি অংশ চলে গেছে বকেয়া পরিশোধে। সঞ্চয়পত্র থেকে দ্বিতীয় প্রান্তিক (জানুয়ারি-জুন) পর্যন্ত এক টাকাও ঋণ আসেনি। ফলে অভ্যন্তরীণ ঋণের জন্য নজর দেয়া হয়েছে বন্ড ও ট্রেজারি বিলের দিকে। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবার সবচেয়ে বেশি ঋণ করছে বন্ড ও ট্রেজারি বিল থেকে। সব মিলে এক ধরনের টানাপোড়েন সংসার চলছে সরকারের।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিদ্যুৎ খাতে ৪৩ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি পরিশোধ করতে সরকারি ও বেসরকারি ২৭টি ব্যাংকের মাধ্যমে বন্ড ইস্যু করা হয়। এর মাধ্যমে বাজার থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। এতে আর্থিক খাতের টানাপোড়েনের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। এই মোটা অঙ্কের দায় মেটাতে আগামী ১০ বছর বন্ডের আসল ও সুদ পরিশোধের জন্য বাজেটে অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে। এছাড়া উন্নয়ন কর্মকান্ডে প্রথম ছয় মাসে যেখানে এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ের কথা। সেখানে শ্লথগতিতে মোট বরাদ্দের মাত্র ১৫ শতাংশ খরচ করা হয়।

তথ্য মতে, বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া ভর্তুকি পরিশোধের জন্য ব্যাংকগুলোকে সাত হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা বিশেষ ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করেছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য এক হাজার কোটি টাকা ছাড় করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ছয় ভাগের এক ভাগ নগদ অর্থ দিলেও বেশির ভাগই পরিশোধ হচ্ছে বন্ডে। এই মুহূর্তে সরকারের বকেয়া অর্থ পরিশোধের অন্যতম উপায় বিশেষ ট্রেজারি বন্ড।এছাড়া সরকারি-বেসরকারি খাতের ২৪টি ব্যাংকের অনুকূলে ছয় হাজার ৫৬৫ কোটি টাকার বিশেষ ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোর ৬০টি গ্রাহক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভর্তুকি বাবদ এসব বন্ড ইস্যু করা হয়েছে। বন্ডের সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহারের ভিত্তিতে। বর্তমানে এ হার ৮ শতাংশের ওপর। এ বন্ডের মেয়াদ আট থেকে ১০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।

পাওনা পরিশোধে ইস্যু হবে আরও ৭ হাজার কোটি টাকার বন্ড

জানতে চাইলে সাবেক অর্থ সচিব (সিনিয়র) মাহবুব আহমেদ বলেন, সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ কমিয়ে ট্রেজারি বন্ড ও বিল থেকে ঋণ নিচ্ছে। কারণ এ খাতে সুদের হার বেশি থাকায় অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কিনছে। আমরা (অর্থনীতিবিদ) ব্যাংক ঋণ কমানোর পরামর্শ আগেই দিয়েছি সরকারকে। এছাড়া বর্তমান সঞ্চয়পত্র থেকে বেশি সুদ দিচ্ছে আমানতকারীদের অনেক ব্যাংক। যে কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমছে। এ খাত থেকে ঋণ কম নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে রাজস্ব আয় আরও বাড়াতে হবে। না হলে আগামীতে ঋণ ও সুদ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে। সেটি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

ব্যাংকাররা জানান, এখন বিনিয়োগে মন্থরগতিসহ বিভিন্ন কারণে ব্যাংকগুলোর ব্যাপক ঋণ চাহিদা আছে তেমন না। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের সঞ্চয় প্রবণতা কমেছে। আবার ডলার সংকট মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে বিক্রি করছে। চলতি অর্থবছর প্রায় ৭০০ কোটি ডলার বিক্রি করে ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি তোলা হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি ব্যাংকের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে মানুষ টাকা তুলে নিয়েছে। আবার গত বছরের জুলাই থেকে গ্রাহক পর্যায়ে ৯ শতাংশ সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা তুলে নতুন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। সব মিলিয়ে সরকারের ঋণের সুদহার দ্রুত বাড়ছে। সুদহারের নতুন ব্যবস্থায় চলতি মাসে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ সুদহারেরর সীমা উঠেছে ১১ দশমিক ৮৯ শতাংশে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী এর আগে গত ২৬ ডিসেম্বরে ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলে সর্বোচ্চ সুদ ওঠে ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ। যে কোনো মেয়াদের বিল-বন্ড মিলে সুদহার ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ। ওই মাসে ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের লেনদেন হয়েছিল ১১ দশমিক ৯৭ শতাংশ সুদে। 

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, যেটা হচ্ছে; তা হলো টাকা না ছাপিয়ে বন্ড ছাড়া হচ্ছে। তা–ও মন্দের ভালো। ব্যাংকগুলো আর পাওনা টাকা চাইবে না; বন্ডের বিপরীতে বরং তাদের কিছুটা আয় হবে। তবে এ উদ্যোগে ঠিকই সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ বাড়বে। তিনি বলেন, সংকটে না থাকলে সরকার এ পথে যেত না।

অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, প্রাথমিকভাবে বকেয়া ভর্তুকিতে সাড়ে ১০ হাজার ৫০০ কোটি ও বিদ্যুতে ১২ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করার জন্য সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ৪০ ব্যাংকের অনুকূলে ইস্যু করা হচ্ছে। বিশেষ বন্ড ও নগদ পরিশোধের মাধ্যমে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিপিডিবির কাছে থাকা আইপিপিগুলোর পাওনা অর্থ শোধ করা হয়েছে। এর আগেও সরকারের এ ধরনের বন্ড ইস্যুর নজির রয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে না পারার কারণে সরকারের হাতে নগদ অর্থসংকট রয়েছে। এ কারণে বন্ডে পরিশোধ ছাড়া বিকল্প নেই। তবে বন্ডে পরিশোধের কারণে সুদ পরিশোধের চাপে থাকবে সরকার। তিনি বলেন, বন্ডে বকেয়া ভর্তুকি পরিশোধ করা একভাবে টাকা ছাপিয়ে অর্থায়নের মতো। এই বন্ড রেখে নগদ অর্থের তারল্য সংকট ঘাটতি মেটাচ্ছে ব্যাংকগুলো। ফলে এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির বিপরীত হয়েছে। কারণ বাজারে নতুন করে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ এসেছে। এর প্রভাব বাজারে পড়বে।

দৈনিক সরোবর/কেএমএএ