স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে বঙ্গভ্যাক্স নতুন মাইলফলক  

আশরাফুজ্জামান মমিন
প্রকাশিতঃ সেপ্টেম্বর ১০, ২০২১ , ৬:২৮ অপরাহ্ন

আমেরিকার মডার্ণার টিকা মডিফাইড mRNA দিয়ে তৈরি, অপরদিকে ফাইজার-বায়োএন টেকের টিকায় mRNA এর সাথে ভাইরাসের ৩টি প্রোটিন যুক্ত কিন্তু আমাদের টিকাটি ন্যাচারেল/পিউর mRNA দিয়ে তৈরি, তাই এটি সবচেয়ে বেশি নিরাপদ ও কার্যকর হবে বলে আশা করছি! মডার্ণা ইদুরে পরীক্ষা করেই মানবদেহে ১ম ও ২য় পর্যায়ে পরীক্ষা করেছে, তারপর মানবদেহে ৩য় পর্যায়ে ও বানরে একসাথে পরীক্ষা করেছে!

অপরদিকে ফাইজার-বায়োএনটেক মানবদেহে ও প্রাণীদেহে একসাথে পরীক্ষা করেছে! আমরা মডার্ণার অনুরূপ প্রক্রিয়ায় মানবদেহে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম, তাই আমরা ইদুরে পরীক্ষা করে মানবদেহে ১ম ও ২য় পর্যায়ে পরীক্ষা করার নৈতিক অনুমোদনের জন্য বিএমআরসিতে আবেদন করেছিলাম কিন্তু সেই অনুমতি আমরা পাইনি! আবেদনের দীর্ঘ ৫ মাস পর বিএমআরসি আমাদের বলেছে আগে বানরে পরীক্ষা করতে হবে, তারপর মানবদেহে! তাই আমরা যখন দেশের বাইরে বানরে পরীক্ষা করতে ব্যর্থ হলাম, তখন ভাবলাম নিজেরা দেশে এই সুযোগ সৃষ্টি করে কোন সিআরও-র মাধ্যমে করতে পারি কিনা? দেখলাম ভারত বায়োটেক ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে মহারাষ্ট্রের জংগল থেকে বানর ধরে এনে তাদের আবিষ্কৃত টিকা কোভ্যাকসিনের পরীক্ষা করেছে এবং সেই টিকা পরবর্তীতে মানবদেহে পরীক্ষা শেষে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে!

পরবর্তীতে বিএমআরসি ভারতের কোভ্যাকসিনকে আমাদের দেশেও মানবদেহে পরীক্ষা করার নৈতিক অনুমতি দিয়েছে! তাই আমরা বিএমআরসির শর্ত পূরণের নিমিত্তে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমতি নিয়ে প্রয়োজনীয় বানর সংগ্রহ করে দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের এথিক্যাল কমিটির অনুমতি ও অনুমোদিত প্রটোকল অনুসরণ করে সিআরও লিমিটেডের মাধ্যমে বানরে পরীক্ষা শুরু করি! প্রাথমিক ফলাফলে আমাদের টিকাটি বানরে নিরাপদ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে! আমরা অক্টোবরের মধ্যে বানরে পরীক্ষা শেষ করে বিএমআরসিতে রিপোর্ট জমা দিতে পারবো বলে আশা করছি! যদি বিএমআরসি আর কালক্ষেপণ না করে নৈতিক অনুমতি দিয়ে দেয়, তাহলে আমরা ঔষধ প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে নভেম্বরের শুরুতেই মানবদেহে পরীক্ষা শুরু করতে পারবো বলে আশা করছি!

গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড এর,কোয়ালিটি এন্ড রেগুলেটরি জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিজ্ঞান সম্পর্কিত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা, লক্ষ্য, নীতি এবং উদ্দেশ্যগুলোর ভিত্তিতে গবেষণায় অগ্রাধিকার ক্ষেত্র নির্ধারণ করে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিজ্ঞানকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে বিএমআরসি গঠন করেছিল! অথচ করোনা মহামারীতে দেশে উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন বঙ্গভ্যাক্সের ট্রায়ালে যাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা, তাদের কোন সহযোগিতাই আমরা পাইনি যেমন বিএমআরসি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের নৈতিক অনুমোদন না দিয়ে দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে সম্পূর্ণ নীরব থেকেছে এবং এই ভ্যাকসিনটির পরীক্ষা চালানোর জন্য কোনো উদ্যোগ নেয়নি। উপরন্তু বিএমআরসি একেক সময় গণমাধ্যমে একেক রকম বক্তব্য দিয়ে সময় নষ্ট করেছে।

সর্বশেষ বানরের শরীরে ট্রায়ালের জন্য শর্ত জুড়ে দেয়া কিংবা এক চিঠির উত্তর দেয়ার আগে নতুন পর্যবেক্ষণ দিয়ে আরেক চিঠি দেয়ার অর্থ হচ্ছে এই ভ্যাকসিনটি যাতে উৎপাদন করতে বা অনুমোদন পেতে আরো অনেক সময় অতিবাহিত হয় এবং এটি যাতে আলোর মুখ না দেখে। যদি বানরের শরীরে টিকা প্রয়োগের কিংবা আরো পর্যবেক্ষণ দেয়া প্রয়োজন হতো তবে বিএমআরসি আরো ৫ মাস আগে গ্লোব বায়োটেককে এসব শর্ত উল্লেখ করতো।

অন্যদিকে আমেরিকার মডার্ণা তাদের ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের নৈতিক অনুমোদন মাত্র ৪ দিনে পেয়েছিল! তাই আমেরিকা দ্রুততম সময়ে ট্রায়াল শেষ করে তাদের mRNA ভ্যাকসিন দিয়ে করোনার সংক্রমণ এবং মৃত্যুর উর্ধগতি নিয়ন্ত্রণ করেছে! আমরা যদি আমেরিকার মতো দ্রুততম সময়ে গ্লোব বায়োটেকের mRNA ভ্যাকসিন ‘বঙ্গভ্যাক্স’ মানবদেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করে আশানুরূপ ফলাফলের ভিওিতে টিকা কার্যক্রম শুরু করতে পারতাম, তাহলে হয়তো আমাদের দেশে করোনার বর্তমান অবস্থা দেখতে কিংবা এতসংখ্যক মানুষকে মরতে হতো না বরং দেশের চাহিদা মিটিয়ে বঙ্গভ্যাক্স বিদেশে রপ্তানি করে আমেরিকার মডার্ণা কিংবা ফাইজার-বায়োএনটেকের মতো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব হতো,যা দেশের অর্থনীতিকে আরো উন্নত ও সম্মৃদ্ধশালী করতো, এতে বাংলাদেশ অচিরেই উন্নত দেশে পরিনত হতে পারতো! আমরা সরকারের সহযোগিতা পেয়েছি যেমন সরকার গঠিত একটি টেকনিক্যাল টিম আমাদের গবেষণাগার পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেছে।

পরবর্তীতে ঔষধ প্রশাসন মানবদেহে ট্রায়ালের জন্য বঙ্গভ্যাক্স উৎপাদনের অনুমতি দিয়েছে এবং সরকার এখনো বানরে টিকার ট্রায়ালে সর্বাত্তক সহযোগিতা করে যাচ্ছে!  এতো সহযোগীতা করার পরও শুধুমাত্র বিএমআরসির অসহযোগিতা কারণে দেশীয় ভ্যাকসিন বঙ্গভ্যাক্স ইস্যুতে সরকার আজ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে, তাই এই জায়গাটায় সরকারের একটু নজর দেওয়া উচিত! আমাদের টিকাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর ১টি ডোজেই এনিম্যাল ট্রায়ালে কার্যকর এন্টিবডি পাওয়া গেছে।

আমরা আশা করছি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালেও অনুরূপ ফলাফল পাওয়া যাবে। এটি +৪° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ১ মাস এবং -২০° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৬ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে। এটি সিন্থেটিক্যালি তৈরি হওয়ায় তা ভাইরাস মুক্ত এবং শতভাগ হালাল। আমরা যদি দ্রুততম সময়ে টিকাটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ করে মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দেশবাসীর সেবায় ‘BANGAVAX’ কে উৎসর্গ করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বদরবারে আরো সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক: দন্ত চিকিৎসক

সংবাদটি শেয়ার করুন »

আপনার মন্তব্য লিখুন

মুক্তকথা : আরো পড়ুন