এ বছর বাংলা সাহিত্য যাদের হারিয়েছে

সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিতঃ ডিসেম্বর ২৯, ২০২০ , ৮:৪৩ অপরাহ্ন

২০২০ সাল সম্ভবত মানব ইতিহাসে অন্যরকম এক ভয়ানক বছরের নাম হয়ে থাকবে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা এর আগের মহামারিগুলো এত পরিমাণ মানুষকে আক্রান্ত করতে পারেনি। এখনো এ করোনা মহামারির লাগাম টানা সম্ভব হয়নি। টিকা আবিষ্কার হলেও কতটা কার্যকরী হবে তারও অপেক্ষায় থাকতে হবে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে লাখ লাখ লোক, যাদের মধ্যে রয়েছে পৃথিবীকে আলোকিত করা এবং মানব সমাজের জন্য কল্যাণকর কাজ করা অনেক মণীষী। সারা পৃথিবীর মতোই এ বছর আমরাও হারিয়েছি আমাদের জাতির নানা ক্ষেত্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সন্তানকে। তাদের মধ্য থেকে কজন লেখককে স্মরণ করছি-

করোনাকালে যাদের হারিয়েছি তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশের খ্যাতিমান শিক্ষক, লেখক ও জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান মারা যান ১৪ মে। তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন সাহিত্য-গবেষণা, লেখালেখি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমেও তার উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে।

আনিসুজ্জামান ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। ৪৭-এর দেশভাগের পর তার পরিবার প্রথমে বাংলাদেশের খুলনাতে আসেন। পরে ঢাকায় স্থায়ী হন। ১৯৫৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স এবং ১৯৫৭ সালে এমএ পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

শিক্ষা, শিল্প-সাহিত্য, সাংগঠনিক ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদকসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

তিনি শিল্পকলা বিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘যামিনী’ এবং বাংলা মাসিকপত্র ‘কালি ও কলম’-এর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক ও সুপরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী ২০ জুন মারা যান। দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা রোগে তিনি ভুগছিলেন এবং ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। শিল্পকলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক কামাল লোহানী কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতা জগতে সক্রিয় ছিলেন।

মুর্তাজা বশীর। তিনি ১৫ আগস্টে মারা যান। তিনি ছিলেন একাধারে চিত্রশিল্পী, লেখক ও গবেষক। ৮৮ বছর বয়সী এই চিত্রশিল্পীর ফুসফুস ও কিডনি জটিলতার পাশাপাশি হৃদরোগও ছিল।

বহু ভাষাবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ছেলে মুর্তজা বশীরের জন্ম ১৯৩২ সালের ১৭ আগস্ট। তিনি নবকুমার ইনস্টিটিউশনে, ঢাকা গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস (বর্তমানে চারুকলা ইনস্টিটিউট) এবং কলকাতার আশুতোষ মিউজিয়ামে পড়াশোনা করেন। ছিলেন ভাষা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী।

১৯৫৫ সালে ঢাকার নবাবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ড্রইং শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯৮ সালে তিনি অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদকসহ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পান।

আবু নাইম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী (কামাল লোহানী) সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ১৯৩৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন।

ভাষা আন্দোলনে জড়িত হওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। পরে কয়েক দফা জেল খেটেছেন এবং একই সঙ্গে কারাগারে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দিন আহমেদের মতো নেতাদের সঙ্গেও। এক পর্যায়ে জড়িত হন বামপন্থী ধারার রাজনীতিতে।

জীবনের শুরু থেকেই কামাল লোহানী ছিলেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বেশ সক্রিয়। ষাটের দশকের শুরুতে পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্রবিরোধী তৎপরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। ১৯৬২ সালে তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন।

১৯৭১ সালে যোগ দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। সে সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদ বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ২০১৫ সালে একুশে পদক পান কামাল লোহানী।

বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক, কবি ও প্রাবন্ধিক মনজুরে মওলা করোনা আক্রান্ত হয়ে ২০ ডিসেম্বর ৮০ বছর বয়সে মারা যান। মনজুরে মওলার নানাবিধ পরিচয়, যিনি জীবনের শেষ দিনগুলোতেও কর্মক্ষম ছিলেন, লিখে গেছেন বিচিত্র বিষয়ে। লেখালেখি, সম্পাদনা, গ্রন্থ পরিকল্পনা- নানা কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন। পেশাজীবনে বাংলাদেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে সব ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পরিচয়টি। আশির দশকে প্রায় তিন বছর তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

তার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অমর একুশে গ্রন্থমেলার ইতিহাস। ‘একুশ আমাদের পরিচয়’ প্রত্যয়ে সে সময়েই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় অমর একুশে গ্রন্থমেলা, আজ যা বিশ্বের দীর্ঘ সময়ব্যাপী চলা বই উৎসব। ঐতিহাসিক বর্ধমান ভবন সংস্কার, প্রথম জাতীয় ফোকলোর কর্মশালা আয়োজন, আরজ আলী মাতুব্বর বা খোদা বক্স সাঁইয়ের মতো লোকমনীষাকে ফেলোশিপ প্রদান, ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ বা ‘ডেভিডসনের চিকিৎসাবিজ্ঞান’-এর মতো বই প্রকাশে উদ্যোগী হয়েছেন তিনি। বাংলা একাডেমিতে তার অসামান্য কীর্তি ‘ভাষাশহীদ গ্রন্থমালা’র ১০১টি বই। এমন অনেক বই এই সিরিজে প্রকাশিত হয়েছে, যা বিষয় হিসেবে ছিল নতুন। এমন অনেকে এই সিরিজে লিখেছেন, যারা পরে সে বিষয়ে অর্জন করেছেন বিশেষ পরিচিতি।প্রশাসক-গবেষক-সম্পাদক-অনুবাদক-কবি মনজুরে মওলা লিখেছেন দুটো কাব্যনাট্য- ‘আমি নই’ ও ‘জালিয়ানওয়ালাবাগ’। তারই পরিকল্পনায় রবীন্দ্রসার্ধশতবর্ষে রবীন্দ্রবিষয়ক ১৫১টি বই প্রকাশ হয়।

কথাসাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্য

বাংলা ভাষার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্য। গত ২৫ জুন দুপুরের দিকে কলকাতার টালিগঞ্জে নিজ বাড়িতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন বর্ষীয়ান এই জনপ্রিয় সাহিত্যিক। তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।

তিনি একাধারে প্রখ্যাত সাংবাদিক, অন্যদিকে খ্যাতিমান লেখক। সাংবাদিকতার পাশাপাশি নিমাই ভট্টাচার্য রচনা করেছেন অন্তত তিন ডজন বই। তার লেখা বইগুলো নানাভাবে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। তবে তাকে মনে রাখার জন্য একটি মাত্র বই-ই যথেষ্ট। সেটি ‘মেমসাহেব’। এই ‘মেমসাহেব’র জন্যই বাংলার তরুণ সমাজের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন ‘রিপোর্টার’ নিমাই ভট্টাচার্য।

তার জন্ম ১৯৩১ সালে। নিমাই ভট্টাচার্য ভারতে জন্মগ্রহণ করলেও তার আদিনিবাস বাংলাদেশের যশোরে। যশোরের সম্মিলনী ইনস্টিটিউশনে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছেন তিনি। তারপর ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় চলে যান কলকাতা। পেশাগত জীবন শুরু হয় সাংবাদিকতা দিয়ে। তার প্রথম উপন্যাস ছাপা হয় অমৃত পত্রিকায় ১৯৬৩ সালে। উপন্যাসটি পাঠকপ্রিয় হয়। ১৯৬৮ সালে প্রকাশ পায় ‘মেমসাহেব’ উপন্যাস। তার প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা ১৫০টিরও বেশি।

তার জনপ্রিয় উপন্যাস ‘মেমসাহেব’ চলচ্চিত্রে রূপ পায় ১৯৭২ সালে। তাতে কেন্দ্রীয় বাচ্চু চরিত্রে অভিনয় করেন উত্তম কুমার। এছাড়া, অভিনয় করেছিলেন মেমসাহেব হিসেবে অপর্ণা সেন। এরপর তার অনেক উপন্যাসের চিত্রায়ণ হয়েছে।

অমৃত পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘রাজধানীর নেপথ্যে’ ছাপা হওয়ার পর লিখেছেন ‘রিপোর্টার’, ‘পার্লামেন্ট স্ট্রিট’, ‘ডিপ্লোম্যাট’, ‘মিনিবাস’, ‘মাতাল’, ‘ইনকিলাব’, ‘ব্যাচেলর’, ‘কেরানি’, ‘ডার্লিং’, ‘নাচনি’, ‘প্রিয়বরেষু’, ‘পিকাডিলী সার্কাস’, ‘কয়েদী’, ‘জংশন’, প্রবেশ নিষেধ, ‘ম্যাডাম’, ‘ককটেল’, ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’, ‘অ্যাংলো ইন্ডিয়ান’ ইত্যাদি উপন্যাস।

জীবদ্দশায় সাহিত্য কর্মের জন্য অসংখ্য স্বীকৃতি পেয়েছেন বরেণ্য এই কথাসাহিত্যিক।

১৯৫০ সালে ‘লোকসেবক’ পত্রিকা দিয়ে সাংবাদিকতা জীবনের শুরু নিমাই ভট্টাচার্যের। তারপর দিল্লিতে গিয়ে বেশ কয়েকটি কাগজের সংসদ, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৫০ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত ৩০ বছরের সাংবাদিকতা জীবনের বড় সময়টা কাটিয়েছেন দিল্লিতে। কাজ করেছেন পাঁচটি কাগজে। বেশিরভাগই সর্বভারতীয় সংবাদপত্র।

দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে জওহরলাল নেহরু, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, ভি কে কৃষ্ণমেনন, মোরারজী দেশাই, ইন্দিরা গান্ধীসহ অনেকের স্নেহভাজন ছিলেন নিমাই ভট্টাচার্য। সাংবাদিকতা থেকে অবসর নেয়ার পর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় কলম লিখতেন তিনি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়েও অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল নিমাই ভট্টাচার্যের।

সাহিত্যিক অরুণ সেন

সাহিত্যিক ও গবেষক অরুণ সেন। গত ৪ জুলাই রাত সাড়ে ৯টায় কলকাতার নিজ বাড়িতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। অরুণ সেন ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন।

অরুণ সেনের জন্ম ১৯৩৬ সালে। পূর্বপুরুষ পূর্ববঙ্গের হলেও কলকাতাই তার আবাস। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ শেষ করে কলকাতারই একটি কলেজে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপনা করেন অবসরকাল পর্যন্ত।

বাংলাদেশের সাহিত্যে তার আগ্রহ ও চর্চার কারণে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে বাংলাদেশ বিষয়ে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে আমন্ত্রিত হন। সেখানকার কর্মসূত্রে বাংলা বিভাগের ওই বিষয়ের পাঠক্রম তৈরি করেন তিনিই।

বাংলাদেশ ও তার সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে অনেক লেখালেখি, সেমিনারে ভাষণ বা পাঠ, বাংলাদেশ-বিষয়ক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে তার সক্রিয়তা সর্বজনবিদিত।

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচনা সভায় তিনি বাংলাদেশের সাহিত্য বিষয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন বা নিবন্ধ পাঠ করেছেন। সেগুলোরই কয়েকটি নিয়ে তার বই সাহিত্যের বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ নিয়ে তার কয়েকটি বই- দুই বাঙালি, এক বাঙালি, বাংলা বই বাংলাদেশের বই, দুই বাংলায় রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য। এ বিষয়ে তার সম্পাদিত বই- বাঙালি ও বাংলাদেশ, দেশে বাংলাদেশে/বাঙালির আত্মসত্তার নির্মাণ, বাংলাদেশের নির্বাচিত উপন্যাস সংকলন ইত্যাদি। তার রচিত ও সম্পাদিত বইয়ের সংখ্যা ৪০ এর অধিক।

বিভিন্ন সময়ে তিনি পরিচয়, সাহিত্যপত্র ও প্রতিক্ষণ- নামের তিনটি পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বাংলাদেশ ছাড়াও তার আরেকটি বিশেষ আগ্রহের বিষয় কবি বিষ্ণু দে। ১৯৭০ সালে প্রকাশ হয়েছে ‘বিষ্ণু দে’র বাংলাদেশ’ বইটি। বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাগদ্য রচনার জন্য ২০১৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি থেকে তিনি বিদ্যাসাগর স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছেন।

শিশুসাহিত্যিক আলম তালুকদার

শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযোদ্ধা আলম তালুকদার গত ৮ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন।

তিনি ছড়াকার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শিশুসাহিত্যের প্রায় সব শাখায় তার স্বাভাবিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত বিচরণ ছিল। তার প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ৮০। শুধু শিশুসাহিত্য নয়, রম্যসাহিত্য রচনাতেও তার ছিল আগ্রহ।

তার ছড়া এবং গদ্যের বইয়ের মধ্যে- ঘুম তাড়ানো ছড়া, প্যাচাল না আলাপ, মহাদেশ বাংলাদেশ উপদেশ, অবশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, কেমন করে স্বাধীন হলাম, এক স্বাধীন তিন রাজাকার, যখন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলাম উল্লেখযোগ্য।

‘চাঁদের কাছে জোনাকি’ ছড়ার বইয়ের জন্য ২০০০ সালে অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। পালক অ্যাওয়ার্ড, জয়নুল আবেদিন পুরস্কার, কাদির নওয়াজ পুরস্কার, পদক্ষেপ সাহিত্য পুরস্কার, সাহস পুরস্কার, স্বাধীনতা সংসদ পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গের চোখ সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন তিনি।

আলম তালুকদারের জন্ম ১৯৫৬ সালে টাঙ্গাইলে। তার আসল নাম নূর হোসেন তালুকদার। ১৯৬৮ সালে দেয়াল পত্রিকার মাধ্যমে লেখালেখি শুরু হয় তার। তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন। নিজেকে ‘অবশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে পরিচয় দিতেন।

কর্মজীবনে তিনি গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেছেন।

লেখক ও গবেষক রশীদ হায়দার

প্রখ্যাত লেখক, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও বাংলা একাডেমির সাবেক পরিচালক রশীদ হায়দার। গত ১৩ অক্টোবর তিনি না ফেরার দেশে চলে যান।

রশীদ হায়দার গল্প-উপন্যাস-নাটক-অনুবাদ-নিবন্ধ-স্মৃতিকথা ও সম্পাদনা সব মিলিয়ে ৭০ এর অধিক বই রচনা করেছেন। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৪), একুশে পদক (২০১৪), হুমায়ুন কাদির পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংকসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

১৯৪১ সালের ১৫ জুলাই পাবনার দোহাপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রশীদ হায়দার। পরিচিতি রশীদ হায়দার নামে হলেও তার পুরো নাম শেখ ফয়সাল আবদুর রশীদ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন হায়দার। ডাকনাম দুলাল।

১৯৫৯ সালে গোপালগঞ্জ ইনস্টিটিউশন থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬১ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পাস করেন তিনি।

বড় ভাই জিয়া হায়দারের উৎসাহে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় তিনি কাজ শুরু করেন চিত্রালী পত্রিকাতে। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ডের মুখপত্র পরিক্রম পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলা একাডেমিতে চাকরি শুরু করেন এবং ১৯৯৯ সালে বাংলা একাডেমির পরিচালকের পদ থেকে অবসর নেন। পরে নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ছিলেন।

কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। তিনি গত ১৭ নভেম্বর রাতে জার্মানিতে নিজস্ব বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন।

কবি অলোকরঞ্জন ১৯৩৩ সালের ৬ অক্টোবর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। শান্তিনিকেতনে প্রথম পাঠ সেরে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্য়ালয় থেকে শেষ করেন স্নাতকোত্তর। এর পর দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে।

হামবোল্ড ফাউন্ডেশন ফেলোশিপ নিয়ে অলোকরঞ্জন একসময়ে জার্মানিতে পাড়ি জমান। বাংলা ভাষার সঙ্গে জার্মান সাহিত্যের মেলবন্ধনের রূপকার হিসেবে পরিচিতি রয়েছে তাঁর। বাংলা কবিতা জার্মান ও ইংরেজি ভাষায় অনুবাদের পাশাপাশি জার্মান ভাষার কবিতাও বাংলায় অনুবাদ করেছেন। জার্মান সরকার তাঁকে গ্যেটে পুরস্কারে ভূষিতও করে। ১৯৯২ সালে মরমী কারাত কাব্যগ্রন্থটি তাঁকে ভারতের  সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার পাইয়ে দেয়।

রবীন্দ্র ধারার কাব্যরুচি থেকে বাংলা কবিতাকে পৃথক খাতে বইয়ে দেয়ার শুরু পঞ্চাশের দশকে। এই সময়ে যাঁরা নিজস্ব ভাষাভঙ্গি নিয়ে লিখতে শুরু করেছিলেন, অলোকরঞ্জন ছিলেন তাঁদের অগ্রপথিক। এপর্যন্ত তাঁর ২০টির ওপর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

শিশুসাহিত্যিক হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী

সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী। গত ২৬ নভেম্বর বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তার মৃত্যু হয়। করোনা উপসর্গ দেখা দেয়ার পর তিনি ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হয়েছিলেন।

হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী সাব এডিটর্স কাউন্সিলের দুবার নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। তিনি অর্থনীতি প্রতিদিন-এর বার্তা সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া, চট্টগ্রামের দৈনিক নয়া বাংলা, ঢাকার দৈনিক দিনকাল, দৈনিক আমার দেশ, পাক্ষিক পালাবদলসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত ছিলেন। হুমায়ুন ছিলেন একজন অজাতশত্রু ধরনের সংবাদকর্মী। তিনি জনপ্রিয় শিশু সাহিত্যিক ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য ছিলেন।

হুমায়ুন সাদেক চৌধুরীর জন্ম চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বৈলছড়ি গ্রামে। ১৯৬০ সালের ৪ মার্চ। ছোটবেলা থেকে বইয়ের সাথে সখ্য। সেই সূত্রে লেখালেখির জগতে। মূলত শিশুসাহিত্যই ছিল তার অঙ্গন, আরো নির্দিষ্ট করে বললে বলতে হয়, ছড়ার রাজ্যেই তার ছিল প্রধান পদচারণা।

তার প্রথম লেখা ১৯৭৬ সালে ছাপা হলেও প্রথম বই কিশোরকবিতাগ্রন্থ এক কিশোরের মন প্রকাশ হয় তার দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পরে, ২০০৯ সালে। অ্যাডর্ন প্রকাশনী থেকে।

কবি আদিত্য কবির

কবি, লেখক ও সৃজনশীল বিজ্ঞাপন ব্যক্তিত্ব আদিত্য কবির। গত ৮ ডিসেম্বর রাতে ঘুমের মধ্যে স্ট্রোক করে মারা যান তিনি।

ক্যারোট কমিউনিকেশন নামের একটা বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন কবি আদিত্য কবির। এর আগে বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিকে অ্যাসোসিয়েট ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। আদিত্য তার কর্মজীবনের শুরুতে সাংবাদিকতা করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত শিক্ষক ও প্রখ্যাত কবি হুমায়ূন কবিরের ছেলে।

সাংবাদিকতার পর পেশা জীবনে পরিবর্তন আনলেও গল্প ও কবিতা লিখতেন আদিত্য। সাংবাদিকতা ছেড়ে চলে যান বিজ্ঞাপনের জগতে। ১৫ বছর বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করেছেন তিনি।

এ ছাড়াও, যাদের হারিয়েছি তারা হলেন-

কাজী নজরুল ইসলাম বাহার

শিখা প্রকাশনীর মালিক কাজী নজরুল ইসলাম বাহার করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ২৫ নভেম্বর রাত ৯টা ৩৭ মিনিটে রাজধানীর আজগর আলী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

হিমেল বরকত

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও কবি হিমেল বরকত মারা যান। গত ২২ নভেম্বর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

আহমদ আজিজ

দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলে যান কবি আহমদ আজিজ। গত ৯ জুন সকালে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

হুমায়ুন কবীর খোকন

করোনা আক্রান্ত হয়ে কবি ও সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর খোকনের মৃত্যু হয়। গত ২৮ এপ্রিল রাত ৯টা ৪১ মিনিটে উত্তরা রিজেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

মাহমুদ টোকন

কবি মাহমুদ টোকন কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে মারা যান তিনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন »

আপনার মন্তব্য লিখুন

সাহিত্য : আরো পড়ুন