আদিত্য‘র জন্য অনেক মন খারাপ লাগে!

সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিতঃ ডিসেম্বর ২৫, ২০২০ , ৩:৩৬ অপরাহ্ন

বন্ধু, কবি, বিজ্ঞাপন জগতের সেলিব্রিটি মানুষ আদিত্য কবির দিনের পর দিন তার খালি পায়ে হাঁটার কারণে আর ১৯৭২ সালে রাজনৈতিক অন্তর্ঘাতে রহস্যজনকভাবে নিহত কবি হুমায়ুন কবিরের ছেলে হিসেবে আমাদের শাহবাগ জীবনে তার বন্ধুদের কাছে ছিল মোটামুটি একটা মিথের মতো। এই হুমায়ুন কবির ছিলেন পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক, ১৯৭১ সালে ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’ প্রতিষ্ঠার পেছনের এক বড় নাম (পরে এরই নাম হয় ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির‘)। পার্টির প্রধান নেতা সিরাজ সিকদারের সঙ্গে বিরোধ থেকে তিনি আদিত্য ও তাঁর বোনকে রেখে ঢাকায় গুলিতে মারা যান মাত্র ২৪ বছর বয়সে।

তাঁর মৃত্যুর পরেই বের হয় তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘কুসুমিত ইস্পাত‘। আমাকে খুব সম্ভব আদিত্যই দিয়েছিল নীলক্ষেতে খুঁজে পাওয়া বাবার বইয়ের একটা ময়লা-ছয়লা কপি। সেটা এখনও আছে আমার কাছে। ওর বাবার বইয়ের নাম প্রসঙ্গে আমরা দুজনে কথা বলেছিলাম ‘অক্সিমোরন‘ নিয়ে, তা-ও মনে আছে আমার—যেমন নরক তা কিনা আবার নন্দিত, ইস্পাত তা কিনা আবার কুসুমিত, অন্ধকার তা কিনা আবার দৃশ্যমান। আমি বলতাম, ‘এগুলা ভাল লাগে না‘। আদিত্য বলত, ‘আমারও লাগেজি না‘। জি-টা সে এমনিই যোগ করত, মনের আনন্দে।

শাহবাগে সেই ১৯৯১-১৯৯৬ এর বছরগুলোতে লেখক হতে চাওয়া সাহিত্যেপ্রেমীদের দল ছিল কয়েকটা। তারই একটা দলে ছিলাম আদিত্য আর আমি। আমাদের সেই দলটার সবার জন্মসাল ছিল ১৯৬৯-১৯৭০ এর দিকে। ব্রাত্য রাইসু বয়সে দু-এক বছর বড় হয়েও যেমন সেই দলের একজন ছিল, তেমন রাইসু মেম্বার ছিল আমাদের সিনিয়রদের দু-একটা দলেরও।

আদিত্য আর আমি মিলে যে গ্রুপটার কথা বলছি সেটা ছিল একরকম বলতে পারেন ‘কবি বায়েজীদ মাহবুব গ্রুপ‘ বা

‘অতীব্র গ্রুপ’ (‘অতীব্র’ কেন তা পরে বলছি), যার সদস্য ছিলাম আমরা মূলত সাতজন—বায়েজীদ মাহবুব, তাজুল হক, রংপুরের আসাদ মাহমুদ, মাসরুর আরেফিন, শামীম কবীর, আদিত্য কবির ও নূরুল আলম আতিক। এই সাত। এর মধ্যে আমি সহ প্রথম পাঁচজন ক্যাডেট কলেজের ছাত্র; শামীম কবীর, আমরা শাহবাগে থাকতেই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করা কবি শামীম কবীর ছিল কলেজে আমাদের দু-তিন ব্যাচ জুনিয়র। আরেকটা নাম মনে পড়ে, যে ছিল আদিত্যের ঘনিষ্ঠ, আমাদের বাকিদের ততটা না—আশিক মোস্তফা।

আদিত্যের অন্য আরেকটা গ্রুপ ছিল শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনিকেন্দ্রিক, যেটাকে বলা যায় ‘তীব্র আলী গ্রুপ’ (সে কারণেই ওপরে আমাদেরটাকে আমি ডাকলাম ‘অতীব্র গ্রুপ’ নামে)। তীব্রদের ওখানে ওরা একসঙ্গে থাকত এই কজন—কবি সাজ্জাদ শরিফ, আদিত্য কবির, ব্রাত্য রাইসু, লীসা অতন্দ্রিলা, আশরাফ আহমেদ জিয়া, টুম্পা নামের একজন, সাজেদুল ইসলাম, আর তীব্র আলী (এবং, সম্ভবত, এবাদুর রহমান।) ওই গ্রুপের আবার সাজ্জাদ ভাই ও রাইসু—এ দুজনের সঙ্গে আমার আলাদা একটা ভালই ঘনিষ্ঠতা ছিল বলা যায়, যদিও আমি তখন দিনরাত পুরোটা কাটাচ্ছি বায়েজীদ-তাজুল-আতিক এদের সাথেই।

আমি ও আদিত্য যে কবি ‘বায়েজীদ মাহবুব গ্রুপে’, তার সঙ্গে জড়ানো রাতদিনের সাহিত্য আড্ডার আরও কিছু নাম এখন মনে পড়ে। কে কবে আদিত্যের মতো হারিয়ে যায়, তাই নামগুলো এখানে লিখে রাখি। প্রথমে আমাদের নারী বন্ধুরা: ফৌজিয়া খান, আয়শা ঝর্না, তানজিয়া জাহান পলি, নভেরা হোসেন, মাহমুদা ইয়াসমিন রোজী (তাজুল হকের স্ত্রী); আর ছেলেদের মধ্যে আহমেদ স্বপন মাহমুদ, ফাখরুল চৌধুরী, মশিউল আলম, জুয়েল মাজহার (জুয়েল মাজহার ও আমি একসঙ্গে একটা জঘন্য পচা বাসায় থাকতাম রামপুরা টিভি স্টেশনের কাছে), মারজুক রাসেল, জহির হাসান, মাতিয়ার রাফায়েল, টোকন ঠাকুর, আর কিছুটা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, কিছুটা রনি আহম্মেদ, কিছুটা শিবব্রত বর্মন—এরকম। সেইসঙ্গে আমার আবার কমবেশি আলাদা একটা বন্ধুত্ব ছিল বয়সে আমার সিনিয়র ক‘জন লেখক-কবির সঙ্গেও, যেমন মাসুদ খান, আজফার হোসেন, মারুফ রায়হান, রাজু আলাউদ্দিন, ফয়জুল লতিফ চৌধুরী (জামিল ভাই), পারভেজ হোসেন, মঈন চৌধুরী, নাসরীন জাহান, ফরিদ কবির, তুষার দাশ, আহমাদ মাযহার, আনিসুল হক, সেলিম মোরশেদ, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, আমার শিক্ষক ও কবি প্রয়াত খোন্দকার আশরাফ হোসেন—এরকম। এখানে বিষয় এই যে, যতগুলো নাম বললাম, এদের সবার কাছেই আদিত্যের ছিল ঈর্ষণীয় এক গ্রহণযোগ্যতা।

কিন্তু শাহবাগের ২৮ বছর পরে আদিত্য যখন আমার সঙ্গে একদিন বনানীতে ওদের অফিসের সামনের এক দোকানে চা খেতে খেতে হাতের আঙুলের কর গুনে বলল: ‘আমরা তো সাতজন ছিলাম রে‘, তখন মনে হল এত এত সাহিত্যপাগল মানুষের ভিড়ে সেই উত্তাল শাহবাগ জীবনে তার মানে আমরা ওই সাতজন সত্যিই, প্রায় আক্ষরিক অর্থে, একসঙ্গে ছিলাম সুখে দুঃখে—লেখক হওয়ার স্বপ্নগুলো মাথায় আর আমাদের কাপড়চোপড় ও চলাচলতির আচরণের সঙ্গে বেঁধে নিয়ে। আদিত্য বনানীতে সেদিন বলেছিল: ‘হুম, সাতজন। আর তোর জানী দোস্ত রাইসুরে ধরতে পারিস। তাইলে আট।‘

আদিত্যের সঙ্গে আমার অনেক অনেক অনেক দিনযাপনের মাথাঘোরানো সব স্মৃতি। তার চিন্তাভাবনা ছিল বেশ নন-কনভেনশনাল, যদিও রাইসুর মত অতটা না, ধারে ও ভারে অত মৌলিকও না। আদিত্যের জন্য আমার ভালবাসা আরেক বিশেষ কারণে যে, সে আমাকে প্রথম পরিচয় করায় কমলকুমার মজুমদারের লেখার সঙ্গে। কোত্থেকে আদিত্য একদিন একটা ‘সুহাসিনীর পমেটম‘ শাহবাগে আনল আর সেটা আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, ‘আমরা তো কবি হব, আর তুই তো কথাসাহিত্যিক, তাই তোর জন্য এইটা আনলাম। এই শোন্ শোন্ (এবার চিৎকার দিয়ে বাকিদের উদ্দেশে)—মাসরুরের জন্য কমলকুমারের একটা কঠিন বই দিলাম। ও জানি আর ওয়ালটার বেঞ্জামিন ওয়ালটার বেঞ্জামিন না করে।’সেই থেকে আমি আজও কমলকুমার মজুমদারের প্রেমে।

সম্ভবত আমি বাংলাদেশের হাতে গোনা দু চারজনের একজন হব যার কিনা কমলকুমারের লেখা এ-টু-জেড প্রতিটা শব্দ পড়া। এই মহান লেখকের মাথার ডেঞ্জারাস ওয়ার্কশপটার মধ্যে ১৯৯৪ এর দিকে আমাকে ঢুকায় ওই আমার পাগলা বন্ধু আদিত্য কবিরই।

আরেকদিনের কথা মনে আছে। পাঠক সমাবেশ-এর পাশের মাঠে সেদিন মাটিতে বোরিং করার তীব্র আওয়াজ। আদিত্য সেই আওয়াজে মহা বিরক্ত। হঠাৎ সে চিৎকার দিয়ে উঠল: ‘আজকে থিকা শাহবাগে সুবিমল মিশ্র বাতিল। যে সুবিমল হতে নেবে, তারে গাড়ির তলাত ফেলানি হবে। হবে কি হবে না?’ আমাদের ওই সুবিমল মিশ্র প্রেমের গোড়ায় ছিলেন কথাসাহিত্যিক সেলিম মোরশেদ, সেটাও এখানে বলে রাখি।

আসলে এসব গল্পের কোনো শেষ নেই। এগুলো তো আর এক দু দিনের গল্প না, কমপক্ষে ৫-৬ বছরের গল্প—শাহবাগে সাহিদুল ইসলাম বিজুর ‘পাঠক সমাবেশ‘ দোকানটা ঘিরে আমাদের রোজকার গল্প, পাবলিক লাইব্রেরির সিঁ

ড়িতে আমাদের গল্প, বায়েজীদের বুয়েট তিতুমীর হল বেড় দিয়ে আমাদের রাত ১১টা থেকে নিয়ে এমনকী ভোর ৪টা পর্যন্তের গল্প (আমি রাতে ঘুমাতাম আমার ঢা.বি.-র বঙ্গবন্ধু হল বাদ দিয়ে বায়েজীদের সঙ্গে তার বুয়েটের তিতুমীর হলে), আমার-আদিত্যের-নূরুল আলম আতিকের ঢাকা মেডিকেল কলেজের আশপাশে রহস্যজনক উদভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরির গল্প, কাঁটাবন, পাবলিক লাইব্রেরি আর নীলক্ষেত মিলে কতো না-লেখা কবিতার, না-লেখা ছোটগল্পের আর না-লেখা উপন্যাসের গল্প।

সময়ের ঝাপসা কাচের ভেতর দিয়ে আমার শুধু এটুকু মনে আছে যে, আমি, আদিত্য কবির ও নূরুল আলম আতিক—এই তিনজনের মধ্যে কী একটা যেন স্পেশাল পারস্পরিক ভালোবাসা ও চিন্তার ঐক্য ছিল কোথায়ও, যেটার ভেতর-বাহির দুদিকেই ছিল অনেক পাগলামি ভরা অনেক কিছু লেখার স্বপ্ন, নতুন বাংলা বর্ণমা

লা প্রণয়নের দুঃসাহস, আর অনেক নিয়ম ভেঙে সাহিত্য ও সিনেমা করার বহু প্ল্যান-প্রোগ্রাম।

আদিত্যের ডাক নাম ছিল সেতু। আমি ওকে সেতু কিম্বা দত্ত বাবু বলে ডাকলে সে একদিন আমাকে বলে বসল, ‘আন্দ্রে ব্রেতোঁ-র Nadja বইয়ের নায়িকার নাম Nadja, আবার কিন্তুক ওইটা নায়িকার নামও না। মাসরুর, না

দজা (বা নাদিয়া) একটা “ওয়ে অব লাইফ”, জানোস তো?’ আমি এর উত্তরে কী বলেছিলাম তা আজ মনে নেই। তবে ওর এই কথাটুকু আজও স্পষ্ট মনে আছে, আর ওর কোনো কোনো কথা শুনে আমার যে মাথা ঘুরত তা-ও মনে আছে, এবং ‘Nadja‘ প্রসঙ্গে সে যে আমাদের সেই ২৫ বছর বয়সেও ভুলভাল কিছু বলেনি সেটাও আমি এখন জানি।

এই যে হঠাৎ আন্দ্রে ব্রেতোঁ, হঠাৎ ব্রেতোঁর উপন্যাস ‘নাদিয়া‘ নিয়ে একটা চমক দেওয়া লাইন বলে বসা—এটাই ট্রেডমার্ক আদিত্য কবির; উৎপলকুমার বসু, রণজিৎ দাশ ও কিছুটা মৃদুল দাশগুপ্ত (তাঁর ‘জলপাই কাঠের এসরাজ‘ নিয়ে আদিত্যের ভালই মাতামাতি ছিল) ছাড়া আমি আমার চিন্তা দিয়ে যাকে সাহিত্যের আর কিছুতেই, সম্ভবত, ততটা সিরিয়াস দেখিনি কোনোদিন।

একবার পাবলিক লাইব্রেরির সিঁড়িতে ওর সঙ্গে আমার ওয়ালটার বেঞ্জামিন নিয়ে বিশ্রী এক ঝগড়ার কথা মনে পড়ে। আদিত্য বলেছিল, ‘ওয়াল্টার বেঞ্জামিন ভুয়া’, আর আমি বলছিলাম, ‘ওয়াল্টার বেঞ্জামিন একটা জিনিয়াস‘, তখন সে বলেছিল তার বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন (ওয়াল্টার বেঞ্জামিন নামটাকে ব্যঙ্গ করে) সব পড়া আছে, আর আমি বলছিলাম, ‘তুই বেঞ্জামিন কিছুই পড়সনি, থাম’। তারপর রাগারাগির এক পর্যায়ে চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ভাই কিম্বা আমাদের দুজনের ওই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, এখনকার আরেক বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার নূরুল আলম আতিক (সম্ভবত এরা দুজন একসঙ্গে), আমাদেরকে মারামারি ঘটানো থেকে বাঁচিয়েছিল। হুমায়ুন আজাদ পরের দিন সন্ধ্যায় বললেন, ‘আদিত্যের কী দোষ? তোমরা

এই জেনারেশনের সবাই তো না-পড়েই কথা বলো। আমার “নারী” ছাড়া আমার লেখা তোমরা কি কিছু পড়েছ? সব তোমরা বইয়ের ব্যাককভার পড়া ছিঁচকে বান্দর কতগুলা। তোমাদের হাতেই বাংলা সাহিত্য ধ্বংস হবে।’ প্রসঙ্গত, হুমায়ুন আজাদের সাড়া জাগানো বই ‘নারী‘ বেরিয়েছিল আমাদের বন্ধু তাজুল হকের নতুন প্রকাশনী ‘নদী‘ থেকে, আমাদের একদম চোখের সামনে।

সময়ের সঙ্গে তাল রেখে আমার ও আদিত্যের মধ্যেকার যোগাযোগ কমে গেল। আমি ব্যাংকার হলাম, সেও হল বিজ্ঞাপনী জগতের বড় এক নাম। এশিয়াটিক-এর সঙ্গে আমেরিকান এক্সপ্রেস (যেটা ২০০৯-এ সিটি ব্যাংকে এসেছিল আমার হাত ধরেই) মিলতে পারে কিনা, মিললে তো ভালোই হতো, ‘আমরা শাহবাগের দুই সাহিত্যিক বন্ধু বাইচুং আর সিনচুং মিলা বাংলা বিজ্ঞাপনের কিছু একটা নতুন নন্দন খাড়া করানো যাইত‘, আর ‘ইউনিট্রেন্ড নামের তোগোর ওই বিজ্ঞাপন কোম্পানি তোর ভাষা আদৌ কি বোঝে, ব্যাটা?‘—এই কথা বলে সে বনানীতে তার অফিসের পাশে এক আড্ডায় আমার ওপরে মায়া থেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিল আমি আমার আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ড ব্যবসার জন্য সঠিক বিজ্ঞাপনী সাহায্যটা পাচ্ছি কি-না, তা নিয়ে। আদিত্য বলেছিল, ‘শোন, এমনিতেই দুনিয়ার বিগেস্ট প্রবলেম যোগাযোগের প্রবলেম। অ্যাড ফার্ম কমিউনিকেশন তুই সামলাস কেমনে? সাহিত্যের লোক ছাড়া গ্রাফিক্স, অ্যাড টেক্সট-কপি, লে-আউট—এই তিন মিল্লা দোস্ত একটা কম্প্লেক্সসমপ্লেক্সছমছম।’

সব মিলে আদিত্য ছিল শাহবাগের কেন্দ্র ও সাহিত্যের পেরিফেরি, দুটোতেই সারাদিন ঘুরে বেড়ানো এক রোমান্টিক, মাটির মানুষ—অনেক ভাল এক ছেলে; কিছুটা চমক দিতে চাওয়া, কিছুটা শো-অফ আর বাকিটা আন্তরিকতা মেশানো দারুণ ভাল এক মানুষ। তার বিখ্যাত খালি পায়ে হাঁটাও ছিল ওই চমকের অংশ। (ব্রাত্য রাইসু খালি পায়ে না, স্যান্ডেল পায়ে হাঁটত; স্যান্ডেল পায়েই সে হাজির আমাদের খুলনার বাসায়; আমার মা বললেন, ‘বাবা রাইসু, জুতা না পরে স্যান্ডেল পরো কেন?’ রাইসু বলল, ‘খালাম্মা, আমাগো বন্ধু আদিত্য তো খালি পায়ে হাঁটে, সামনে আপনার ছেলে স্যান্ডেলও পরবে না, খালি পায়ে হাঁটবে‘।) আদিত্যের বাবাও ছিলেন ওই রোমান্টিক ঘরানারই সমাজবদলের স্বপ্ন দেখা এক কবি (হুমায়ুন কবিরের বিখ্যাত কবিতা ‘পার্শ্ববর্তিনী সহপাঠিনী‘ মনে আছে? ‘দুটা বিশে উড়ে গেল দুটা দাঁড়কাক’—ঠিক বললাম তো?) আদিত্যের মধ্যে রোমান্টিক স্বপ্ন ছিল অনেক, তবে তার বিখ্যাত বাবার মতো ‘সমাজবদল‘ সেই স্বপ্নের তালিকায় কখনও ছিল বলে আমার মনে হয় না। বিষয়টাকে শেষ বিচারে ভালই তো বলতে হবে। আমার বয়সী এই সাহিত্য এবং সিনেমার পাগল ছেলেটা হঠাৎই সেদিন, শুনেছি, ঘুমের মধ্যে মরে গেল। টুপ করে। ঝুপ করে। সাতসকালে তাজুল হক আমাকে মেসেঞ্জারে ম্যাসেজ পাঠাল। আমি সেই ম্যাসেজ দেখে গায়ে-কাঁটা-দেওয়া এক অনুভূতির গর্তে গিয়ে হামলে পড়লাম।

সব ছাপিয়ে আমার মনে পড়ে আমার ও আদিত্যের পুরোনো ঢাকার এক আজগুবি নাচের বাড়িতে বাকরখানি খাওয়ার গল্প। ওখানে শুধু আমরা দুজন সেদিন, রাত তখন একটা মতো বাজে, আমাদের সঙ্গে বন্ধু নূরুল আলম আতিকও নেই, তাজুলও নেই, বায়েজীদ কিম্বা আসাদও নেই। সেই গল্প পুরোটা বলতে গেলে দুই পৃষ্ঠা লাগবে এবং তা অন্য কারো কাছে কিছুই মিন করবে না। আমি আর আদিত্য সেই রাতে তিনটার দিকে হাঁটতে হাঁটতে আমার বঙ্গবন্ধু হলে ফিরেছিলাম, ফিরেই সে আমার হলের ছোট বেডে পাঁচ মিনিটের মধ্যে গভীর ঘুমে, আর আমি রুমের ক্ষীণ আলোয় ডেরেক ওয়ালকট পড়ার চেষ্টা করছি, আর আদিত্য আমাকে তার ঘুমের আগে বা ঘুমের মধ্যেই বলে গেছে: ‘মাছারূর, তোর কবি দেয়ালকট (মানে ওয়ালকট) শালা একটা চুতিয়া ভুয়া, আতিকরে জিগাইস, খোন্দকার আশরাফ হোসেন তোরে নষ্ট কর্তেছেং।’ ওর সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়েছিল এই বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি। তারিখ সহ আমি সেটা জানি, কারণ বইমেলা থেকে বাড়ি ফিরে সেদিন আমার ‘স্পেশাল‘ উপন্যাসের ড্রাফট লেখার নোটবুকে আমি লিখে রেখেছিলাম নিচের এই কথাগুলো:

বেশ অনেকদিন পরে আদিত্য ফোন করল। থতমত খেয়ে গেলাম। আমি তখন বাংলামোটরে। আহমেদ স্বপন মাহমুদও ফোন দিল। শাহবাগ লাইফের দুই বন্ধু। আদিত্য আমাকে ক্ষেপাল যে, ‘উপন্যাসের নাম তুই আলথুসার না রাখিয়া আদিত্য রাখিলে কী ক্ষতি হইতো? দুইটাই তো আ দিয়া।‘আর বলল, ‘ফোন করলে ধরিস না কেন? আতিক (নূরুল আলম আতিক) তোর কথা বলছিল। আমি কিন্তু বলছি যে, তোর চেহারার সেই গরিব ভাবটা আর নাই। হা হো হা হো।‘

আদিত্যকে আমি দেখা করার কথা বললাম। তার গলা থেকে শব্দ হল কেমন ‘উহুগ উহুগ‘—বুয়েটের রাস্তায় ১৯৯৪-এর রাত ৩টায় হাঁটাহাঁটির সময়ের মতন।

আদিত্য হঠাৎ আমাকে সেই দূর অতীতের অর্থহীন ৫-৬ শব্দও বলে বসল। এগুলোর কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক তা এখন আর স্মৃতি খুঁজে বলা যাবে না। যেমন সে বলল যে, ‘মনসসোডাক‘ (এটা ছিল শব্দটা?), আর বলল, ‘শপ্রাববোন‘ (ঠিক আছে; মানে— হে, নর মানুষ?) আর ‘বন্ধু, মহিপ্রমৌশল‘। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘মহিপ্রমৌশল মানে যেন কী ছিল? ২৮ বছর পরে আর মনে আছে নাকি?‘ আদিত্য উত্তর দিল: ‘আমাদের মধ্যে তুই-ই ব্যাটা লেখক হইলি তাইলে। তোর দ্বিতীয় উপন্যাস বৈরাইলো। এইটাই মহাপ্রমৌশল।‘

আমি লক্ষ্য করলাম, ‘মহি‘ এই দফা ‘মহা‘ হল। আমি তাই বললাম, ‘প্রটেস্ট, দত্ত বাবু। জিনিস লগিক্যাল হলে হইবেক না।‘ আদিত্য আমার কথায় কেমন বিভ্রান্ত মতো হয়ে গেল এক মুহূর্তের জন্যে। আমি বললাম: ‘শুধু আমি কেন, শালা? শাহবাগে আমাদের না খাইয়া থাকাদের মধ্যে রাইসুও তো লেখক হৈল। তুই-ই খালি হৈলি না‘। [আমাদের গ্রুপের কবি বায়েজীদ মাহবুবও লেখক হয়নি, যদিও ওরই হওয়ার কথা ছিল সব থেকে বেশি।] আদিত্য এরপর বলল, ‘দেখা হবে। তুই আমার অফিসের এদিক আয়…ভালো একটা বসার জায়গা আছে রে…বউ নিয়া আইস।‘
আমি বললাম, ‘ওকে।‘

সে বলল, ‘মহৎপ্রোমৌশল মাসরুর-ঘাসরুর-ব্যাংকারুর আলথুসারুর-এর জন্য তোরে পেন্নাম।‘ শালা আগের মতোই পাগল। কথাটা বলেই কেমন সে হুট করে ধুম করে ধাম করে ঝক আর মুখে চত্ক্ করে ফোন রেখে দিল।

– ২০.২.২০২০ রাত ১১:২০।

মাসরুর আরেফিনের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

সংবাদটি শেয়ার করুন »

আপনার মন্তব্য লিখুন

সাহিত্য : আরো পড়ুন