বাংলাদেশে ভাস্কর্য বিতর্ক: বিশিষ্টজনদের ‘মত-দ্বিমত-অভিমত


প্রকাশিতঃ ডিসেম্বর ৬, ২০২০ , ৫:১৬ অপরাহ্ন

ভাস্কর্যের ইংরেজি শব্দ Sculpture। ভাস্কর্য হলো— দৃশ্যশিল্পের এমন একটি শাখা, যাতে শক্ত বা প্লাস্টিক উপাদানের সাহায্যে ত্রিমাত্রিক অবয়বকে উপস্থাপন করা হয়। ভাস্কর্য আমাদের অভিজ্ঞতা এবং বোধকে নানাভাবে উজ্জীবিত করে। এর মাধ্যমে আমরা আনন্দ-বেদনার উপলব্ধি পাই; ভাস্কর্য আমাদেরকে বিস্মিত করে, সচেতন করে, স্মৃতিকাতরতাকে জাগ্রত করে কিংবা নতুন স্বপ্ন দেখানো শেখায়। এভাবে ভাস্কর্য মানুষের জীবনে শিল্পের বোধে এক নতুন মাত্রা সৃষ্টি করে এবং একইসাথে ব্যক্তিগত বা সামাজিক সম্পর্ককে নিবিড় করে তোলে। ভাস্কর্যের ইতিহাস অন্বেষণে মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারা খুঁজে পাওয়া যায়। একইসাথে মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, ধর্মীয় দর্শন বা কথা, রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় ক্রমবিবর্তনের ধারাকে অনুধাবন করা যায়।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে দেশে সম্প্রতি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দাবিকারী হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক প্রকাশ্যে এই বিতর্ক উস্কে দেয়ার পর সংগঠনটির নবনির্বাচিত আমির জুনায়েদ বাবুনগরীও গত শুক্রবার (২৭ নভেম্বর) চট্টগ্রামের এক সমাবেশে ভাস্কর্যবিরোধী অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। এর ঢেউ এখন সংক্রমিত করছে অন্য ইসলামি দলগুলোকেও। এর বিপরীতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকারের ছাত্র ও যুব অঙ্গ ও ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনগুলোসহ বাম ও প্রগতিশীল ধর্মভিত্তিক কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও তাদের ছাত্র সংগঠন। তবে এই বিতর্ক ওঠায় সঙ্গতকারণে প্রশ্ন জাগে, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যই কি দেশে প্রথম?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে ভাস্কর্য নির্মাণের আছে দীর্ঘ ইতিহাস। দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের প্রতিকৃতি নির্ভর ভাস্কর্যগুলোর সংখ্যাও কম নয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্যতম পুরনো ভাস্কর্যটি রয়েছে বগুড়ায়। ইংল্যান্ডের রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের এই আবক্ষ ভাস্কর্যটি ১৯০১ থেকে ১৯০৫ সালের মধ্যে তৈরি করা হয়।

ভাস্কর্যকে মূর্তির সঙ্গে তুলনা, বিরোধিতা ও ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে দেশে চলমান বিতর্কের মধ্যে এর সমাধানের পথ দেখিয়েছেন ইমেরিটাস অধ্যাপক, লেখক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আতাউর রহমান মিয়াজী, ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান, ইতিহাসবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব, ভাস্কর রাসা ও ভাস্কর অখিল পাল।

ইমেরিটাস অধ্যাপক, লেখক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ব্রেকিংনিউজকে বলেছেন, মুজিববর্ষে মুজিবেরই ভাস্কর্য ভাঙার হুমকি ভয়ঙ্কর বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করি। এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। দিন দিন সাম্প্রদায়িক শক্তি বিকাশ লাভ করছে। ফলে আমাদের এমন আন্দোলন দেখতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকার সবচেয়ে বড় যে অন্যায় করেছে, তা হচ্ছে হেফাজতের দাবি মেনে নিয়ে শিক্ষানীতির সর্বনাশ ঘটিয়েছে। কোনও প্রকার আধুনিকায়ন না করে কওমি শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি মান, সনদ প্রদান করা হয়েছে। এতে মৌলিক শিক্ষার উন্নয়ন না ঘটিয়ে শিক্ষা-সংস্কৃতির নিম্নগামিতা নিশ্চিত করা হয়েছে। ক্ষমতায় টিকে থাকতেই আওয়ামী লীগ হেফাজতকে সঙ্গে নিয়েছে। বিএনপি এদের ব্যবহার করতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই আওয়ামী লীগ হেফাজতকে হাতছাড়া করতে চায়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আতাউর রহমান মিয়াজী ব্রেকিংনিউজকে বলেছেন, আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ সমালোচনা করতে ভালোবাসে। প্রশ্ন হল যে বিষয় নিয়ে আমি আলোচনা-সমালোচনা-পর্যালোচনা করবো বিষয়টির ওপর আমার পর্যাপ্ত জ্ঞান আছে কি-না সেটা আগে দেখতে হবে। আমরা বিষয়টি কখনও বিবেচনা করিনা। আমাদের অধিকাংশ মানুষ তাদের ইচ্ছামতো না জেনেই কথা-বার্তা শুরু করে দেয়। ভাস্কর্য, মূর্তি ও ছবি এগুলো মৌলিক কিছু ব্যাপার। এগুলো নিয়ে সবাইকে কথা বলাটা উচিত না। এগুলো নিয়ে যারা সত্যিকার অর্থেই পড়াশোনা করেছেন, ইসমালিক চিন্তাবিদ, গবেষক, মুস্তাহিদ তারা কোরআন ও সুন্নার ব্যাপারে জেনে তার আলোকে কথা বলবেন- তা কার্যকর হবে। কিন্তু অরিজিনাল (আসল) মুফতি, ইসলামি চিন্তাবিদরা এগুলো থেকে দূরে থাকেন বলেই অন্ধরা সুযোগ নেয়। একটা পর্যায়ে অন্ধরা এগুলো এমনভাবে ঘোলাটে করে ফেলেন তখন আসল ব্যক্তিরা সেখানে হাত দিতে চান না।

তিনি বলেন, ভাস্কর্য হালাল কি হারাম; বৈধ না অবৈধ; এটা নিয়ে শুধু কথা বলবে ওই লাইনের অভিজ্ঞরা। সবাই যদি যার যার মতো করে বলা শুরু করে সেটার আর গুরুত্ব থাকে না। কেউ যদি এটা বিরোধিতা করতে চান যে, ভাস্কর্য নিষিদ্ধ-হারাম; সেটার প্রতিবাদ করার একটা ভাষা আছে, একটা সিস্টেম আছে। ভাস্কর্য নিয়ে বাড়াবাড়ি করা, উগ্রতা প্রদর্শন করা এটা ইসলাম কেন কোনও ধর্মই সমর্থন করে না। আমাদের হুজুরদের ভেতর কিছু আছে অতি উৎসাহী ও লাগামহীন কথাবার্তা বলায় পটু। তারা ভালো জিনিসটাকে বাড়াবাড়ি করতে যেয়ে খারাপ করে ফেলে। ভাস্কর্য নিষিদ্ধ-হারাম তাই বলে তা বুড়িগঙ্গায় নিক্ষেপ করবে এটা হলো বাড়াবাড়ি। সুতরাং প্রতিবাদের ভাষা মার্জিত হওয়া দরকার।

অধ্যাপক ড. মো. আতাউর রহমান মিয়াজী বলেন, প্রতিমা, প্রকৃতি ও ভাস্কর্য এগুলো ত্রিমাতৃক। এগুলোর ছবিতে ছায়া হয়। সে কারণে ইসলামে নিষিদ্ধ। ইসলাম এগুলো কখনও উৎসাহিত করে না। বিনা প্রয়োজনে ছবি তোলাও হারাম। ছবি দ্বিমাত্রিক আর প্রতিকৃতি ত্রিমাতৃক এটা আরও জটিল। কিন্তু যদি জাতির প্রয়োজনে, মানুষের প্রয়োজনে, ছাত্র-শিক্ষকদের বিষয়টাকে সামনে নিয়ে শিক্ষা দেয়াসহ ইত্যাদি প্রয়োজনে সংরক্ষণ করতে হয় সেটা ল্যাবরেটরিতে সংরক্ষণ করা যায় কিংবা জাদুঘরে। এগুলোকে হারাম বলার সুযোগ নেই। একই বিষয় পদ্ধতির কারণে নিষিদ্ধ হয়ে যায়; আবার ওই বিষয়টায় পদ্ধতির কারণে নির্দোষ প্রমাণিত হয়।

তিনি আরও বলেন, জাতির প্রয়োজনে, মানুষের কল্যাণে ও শিক্ষার কোনও ব্যাপার থাকে তাহলে পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা যায়। কিন্তু প্রয়োজন ছাড়া একটা কিছু করা নিষিদ্ধ। এই বিষয়গুলো আমাদের দেশের জ্ঞানীরা জ্ঞান প্রয়োগ করে বলতে চান না। যারা কম পড়াশোনা করেছেন, কম জানেন, আবেগ নিয়ে কথা বলেন, উল্টাপাল্টা বলেন তারা এক প্রকার ভেজাল তৈরি করেন। ভাস্কর্য হারাম-নিষিদ্ধ এটা ভদ্রভাবে জ্ঞানের আলোকে বলতেই পারেন। এজন্য ঝগড়াঝাঁটি-গালিগালাজ করা লাগে না।

দ্বিতীয়ত, সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানকে ব্যক্তিগতভাবে পরামর্শ দিতে চাই- মিডিয়া, টকশো, মিছিল-মিটিং, প্রতিবাদ সভা, মানববন্ধনে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফতোয়া বোর্ডের টিমের সদস্যরা বসেও এ বিষয়ে একটা সমাধান দিতে পারে অথবা প্রধানমন্ত্রী যদি মনে করেন তাদের (ফতোয়া বোর্ডের) সিদ্ধান্ত যথেষ্ট না। তাহলে দেশে প্রতিষ্ঠিত ইসলামি চিন্তাবিদ যারা আছেন তাদের সমন্বয়ে বড় পরিসরে মুফতিদেরকে নিয়ে একটি ফতোয়া বোর্ড গঠন করতে পারে। তারা কোরআন ও সুন্নার রেফারেন্স বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত জানাতে পারে। যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্য মহৎ। উদ্দেশ্যটাকে কখনও অন্যভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই না। ভাস্কর্যের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে সবার স্মৃতিতে রাখতে চান। এটা ইসলাম কতটুকু অনুমোদন করে, কোন দৃশটিতে অনুমোদন করে বা কতটুকু হলে এটা মানানসই হয় সেটা ফতোয়া বোর্ডের মুফতিরা ভালো একটা সমাধান দিতে পারবেন। সেই সমাধানের আলোকে করলে এই ইস্যুটাকে কেউ রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার চেষ্টা করবে না।

ড. মিয়াজী আরও বলেন, কোরআনে আছে- মদ পান করা হারাম; কবিরাহ গুনাহ। বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে মদ নিষিদ্ধ, অন্যদিকে মদের বারও আছে। এই মদ নিষিদ্ধ করার জন্য বাংলাদেশের কোনও মাওলানা-মৌলবি বুড়িগঙ্গায় নিক্ষেপ করার কথা বলে নাই কেন? এছাড়াও এগুলো নিষিদ্ধ করার জন্য কেউ কখনও জোর দাবি জানায় নি।

ইতিহাসবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন ব্রেকিংনিউজকে বলেছেন, ভাস্কর্যের বিপক্ষে একটি গোষ্ঠী সব সময় সমালোচনা করেছে। এটা নতুন কিছু না। সরকারের নমনীয় ও আমাদের নিশ্চুপ থাকার কারণে তারা নতুনভাবে বলার সাহস পেয়েছে। ডিসেম্বর মাস চলছে তাই তারা পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলে দেখলো লোকজন পুরোপুরি পাকিস্তানি হয়েছে না হয়নি। এটা তারা প্র্যাকটিস (অনুশীলন) করলো। বরাবরই দেখে আসছি মার্চ আর ডিসেম্বর মাসে দল-পার্টি আর থাকেনা, বাংলাদেশের মানুষ সব এক হয়ে।

ভাস্কর্যের বিরোধিতা একটি গোষ্ঠী সব সময়ই করবে জানিয়ে তিনি বলেন, এ দেশের অধিকাংশ মানুষ অন্ধ, তাদের কোনও আইডিয়া নেই, রাজনীতিবিদদের আদর্শের রাজনীতি আর নেই। দলের বাইরে যারা আছে কিংবা তরুণরা যখন নামবে তখন তারা এসব বলা বন্ধ করবে। দেশটা তাদের না, দেশটা সবার। তবে আমাদের দেশ হলে আমাদেরকে নামতে হবে। এটাই আমি বুঝি, এর বাইরে কোনও ব্যাপার নেই। দুর্বৃত্তদের ভালো কথা, উদাহরণ কিংবা ইসলামের কথা বুঝিয়ে কোনও লাভ নেই। কারণ আমি বলেছিলাম- ওরা যদি পারে তাহলে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে যে ভাস্কর্য আছে সেটা আগে ভাঙুক।

যারা ভাস্কর্যের বিরোধিতা করছেন তাদের ব্যাপারে কোনও পরামর্শ আছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের উদ্দেশ্যে পরামর্শ দেয়ার কিছু নেই। সরকার কঠোর হবে, রাস্তায় লোক থাকবে ওরা আর নামবে না।

বিষয়টি নিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ব্রেকিংনিউজকে বলেছেন, আলেমরা আমাদের শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তাদের এসব বিতর্কে জড়ানো উচিত নয়। মাদরাসার লোকেরা কেন বলাৎকারে জড়িত? কেন যৌন নিপীড়ন করে? এর থেকে কীভাবে জাতিকে রক্ষা করা যায়, এসব ব্যাপারে হেদায়েত করতে যাওয়া উচিত। মাদরাসার শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলবো- আপনারা পান খাবেন না। পান খাওয়া শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তারা ঠোঁট রাঙানোর জন্য পান খান। মক্কা বিজয়ের পরে সব মূর্তি ভেঙে ফেলা হলেও একটি মূর্তি ভাঙা হয় না। সেটা খুব বড় এবং হাজীরা সেটাতে এখন চুমু দিতে যান। সেটাও তো একটা ভাস্কর্যই, একখানা পাথর খণ্ড।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ ব্রেকিংনিউজকে বলেছেন, ২০০ বছর আগে যখন মানুষের ভাস্কর্য, শিল্পকর্ম ও ধর্ম নিয়ে কোনও ধারণা ছিল না তখন যদি ভাস্কর্য নিয়ে বিরোধিতা করতো তখন মানানসই হতো। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এগুলো মানানসই বিতর্ক না। ভাস্কর্য একটা শিল্পকর্ম। আমাদের দেশে ভাস্কর্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু ভাস্কর্য নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠা ঠিক না। এটা নিয়ে বিরোধিতা করার কোনও যুক্তিই থাকতে পারে না।

দেশে যারা ভাস্কর্যের বিরোধিতা করছে তাদের উদ্দেশ্যে কোনও পরামর্শ আছে কি-না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশে দুর্নীতি হচ্ছে, সম্পদ পাচার হচ্ছে, নদী-নালা, খাল-বিল দখল হচ্ছে, দেশের মধ্যে নিপীড়ন-অত্যাচার কিংবা ধর্ষণ-অবিচার এগুলো নিয়ে কোনও উত্তেজনা এদের মধ্যে কখনও দেখা যায়নি। তাদের এতো লোকবল, তারা যদি এসবের বিরুদ্ধে কথা বলতো তাহলে দেশের অবস্থা আরও ভালো থাকতে পারতো।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির ব্রেকিংনিউজকে বলেছেন, একটি গোষ্ঠী ভাস্কর্য নিয়ে কথা বলছে, এটা শুধু বাংলাদেশেই। পৃথিবীর কোনও মুসলিম দেশে কোনও গোষ্ঠী ভাস্কর্য নিয়ে কথা বলে না। কারণ এর সঙ্গে ইসলামের কোনও সম্পর্কই নেই। ভাস্কর্য রয়েছে রাস্তার মধ্যে, এর সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক কোথায়? মানুষ কি ভাস্কর্যের পূজা করে? সৌদি আরব থেকে শুরু করে মিশর, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানসহ বড় বড় মুসলিম দেশে ভাস্কর্য রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার কয়েকটা প্রদেশে শরিয়া আইন রয়েছে, ইরানে শরিয়া আইন আছে সেসব দেশে ভাস্কর্যে বিরুদ্ধে কেউ কোনোদিন কথা বলেনি। ইরান ও ইন্দোনেশিয়ায় শত শত ভাস্কর্য আছে। একমাত্র বাংলাদেশেই একটি গোষ্ঠী ভাস্কর্য নিয়ে কথা বলে, এটি এদের একটি উপলক্ষ মাত্র। এরা কখনও ভাস্কর্য নিয়ে কথা বলবে, কখনও নাস্তিক-মুরতাদের ফাঁসি দিতে হবে বলবে, গলা কাটতে হবে বলবে, কখনও বলবে কাদেয়ানীদের কাফির ঘোষণা করতে হবে। তাদের একমাত্র টার্গেট বাংলাদেশকে মোল্লা ওমরের আফগানিস্তান বানাতে হবে।

তিনি বলেন, জামায়াত ইসলামীর জ্ঞাতি ভাই তুরস্কের একে পার্টি গত ১৮ বছর ধরে ক্ষমতায়। সেই তুরস্কের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে এসে তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে বলে গেছেন, ঢাকায় একটি কামাল আতাতুর্কের ভাস্কর্য ও তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় একটি বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য তৈরি করা হবে। এটি আমাদের জন্য বিগ নিউজ। তুরস্কে যেখানে ইসলামের সুফিদের ভাস্কর্য আছে, তুরস্কে বহু মসজিদের সামনে ভাস্কর্য আছে সেখানে ৪০০ বছর ধরে যে অটোমানরা ক্ষমতায় ছিল কেউ কখনও বলেনি- এসব ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হোক। বরং অটোমানরা তাদের সুলতানদের বহু ভাস্কর্য বানিয়েছে। তুরস্কে কামাল আতাতুর্কের ভাস্কর্য গুণে শেষ করা যাবে না।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে ভাস্কর্য নিয়ে যারা সমালোচনা করছে তাদেরকে জামায়াত-বিএনপি পেছন থেকে উস্কে দিচ্ছে। সরকারের কেউ কেউ তাদেরকে এতোদিন প্রশ্রয় দিয়েছে। সেজন্যই বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য তারা বুড়িগঙ্গায় ফেলার কথা বলতে স্পর্ধা পেয়েছে। বাংলাদেশকে যারা আফগানিস্তান-পাকিস্তান বানাতে চায় তাদের জায়গা সেখানে। তাদের জায়গা বাংলাদেশে নয়। হয় তাদের জেলে থাকতে হবে না হয় তাদের আফগানিস্তান যেতে হবে, এর মাঝামাঝি কোনও জায়গা নেই। এদের এজেন্ডা ভাস্কর্য না, এদের এজেন্ডা বাংলাদেশকে মোল্লা ওমরের আফগানিস্তান বানানো। এদের উদ্দেশ্য বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে একটি সন্ত্রাসী-মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব ব্রেকিংনিউজকে বলেছেন, প্রথমত ভাস্কর্য হলো একটি অভিব্যক্তি। এই অভিব্যক্তি আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতির সঙ্গে অবয়ব হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও আমাদের ইতিহাস, স্বাধীনতা, মহান ব্যক্তির কাজের বর্ণনা করার জন্য অথবা তাদের অমর করার জন্য ভাস্কর্য অবয়ব ও উপস্থাপন হিসেবে কাজ করে। একইসঙ্গে একজন ব্যক্তির ভাস্কর্য একটি দেশের কিংবা রাষ্ট্রের চরিত্র গঠন হিসেবে কাজ করে। তা ধর্মীয় অথবা সংস্কৃতিক অনুসাচণের মধ্য দিয়েই হয়। ভাস্কর্য নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা রাজনীতির কু-চর্চার অংশ ছাড়া অন্যকিছু না। এই দেশ ধর্ম ও সংস্কৃতিকে নিয়ে বহমান নদীর মতো বছরের পর বছর চলছে। যারা এগুলো নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে তাদের উচিত সাংস্কৃতিক প্রজ্ঞাবান ও ধর্মীয় বিষয়ে যারা প্রজ্ঞাবান তাদের পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মধ্যে দিয়ে সুনির্দিষ্টকরণ। ঝগড়া করা কখনোই একটি জাতির কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। শুধুশুধু বিতর্ক সৃষ্টি করে আমাদের অর্জন, মুক্তিযুদ্ধ, বিরত্ব, ইতিহাসের কর্ম গাঁথাকে খাটো করার দরকার নেই তেমনইভাবে ধর্মীয় অনুশাসন মূল্যবোধকে অবমূল্যায়ন করার চেষ্টার প্রয়োজন নেই।

তিনি বলেন, কৃষিবিদ ইনিস্টিউট অথবা বনানী কবরস্থানের সামনে ভাস্কর্য তা সামঞ্জস্যতা বিধান মেনেই করা।  এই ভাস্কর্যের মাধ্যমে এমন কোনও কিছু নেই যাতে কাউকে অবমূল্যায়ন করে। অশ্লীলতা থাকতে পারে এমন নারী মূর্তির ভাস্কর্য নিশ্চয়ই বাংলাদেশে আমরা প্রত্যাশা করি না। আমাদের দেশে অশ্লীলতা থাকলেও অন্য দেশে তা শ্লীল হতে পারে। এই শ্লীল ও অশ্লীলতা জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতি অনুযায়ী যুগ যুগ ধরে পার্থক্য রয়েছে।

ভাস্কর রাসা ব্রেকিংনিউজকে বলেছেন, গোলাম আযম গং ও স্বাধীনতার বিরোধী চক্র ছলে-বলে-কৌশলে প্রতিবার এ কাজটা করে যাচ্ছে। এ দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে ধর্মকে পুঁজি করে তারা ধর্ম ব্যবসায়ী, মুখোশধারী। ১৯৭৬ সালে ইসলামি জলসা থেকে এসে ওসমানী উদ্যানে অপরাজেয় বাংলা ভাঙতে আসছিল তারা। এসময় তারা বলছিল ‘চাঁদ-তারা পতাকা চায়, সামনে আছে তোয়াব ভাই’। জিয়াউর রহমানের সে সময় সম্ভবত তোয়াব ছিলেন এয়ার ভাইস মার্শাল। তখন পুরান ঢাকা ও বুলবুল একাডেমি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পাহারা দিচ্ছিল, তখন আমরাও গিয়েছিলাম। দেখেছি এই মৌলবাদী গোষ্ঠী, জঙ্গি গোষ্ঠীদের ভয়াবহ তৎপরতা। এরপর মতিঝিলে বকের ভাস্কর্য, লালনের ভাস্কর্য ভাঙ্গার জন্য তারা চেষ্টা চালিয়েছে।

তিনি বলেন, তারা সব সময় জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালিয়েছে। তাদের ভেতরে ছোট পাকিস্তান। বগলে তাদের চাঁদ-তারা পতাকা। তাদের বিষয়ে সরকার কী করছে জানিনা তবে জনগণ কিন্তু অনেক সচেতন। এরা মৌলবাদী ধর্মান্ধ গোষ্ঠী, সুযোগ বুঝে এরা এই কাজগুলো করে। তাদের কত বড় ঔদ্ধত্যতা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ফেলে দেবেন বুড়িগঙ্গায়? এই স্পর্ধা কোথা থেকে পায় তারা? এখানে সংবিধান অবমাননা, অলংঘন, বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করা মানে বাংলাদেশকে অস্বীকার করা। আর বাংলাদেশকে অস্বীকার করা মানে ৩০ লাখ শহীদদের অস্বীকার ও দুই লাখ মা-বোনদের সম্ভ্রমকে অস্বীকার করা হচ্ছে।

ভাস্কর রাসা বলেন, এটি মুক্তিযুদ্ধের অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। মুক্তিযুদ্ধের সামনে ৫০ বছর পূর্তি আসছে, বর্তমানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শতবর্ষ চলছে। এই অবস্থায় তারা এ ধরনের কথা বলার সাহস কীভাবে পেল? এখন পর্যন্ত রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নিল না। শেখ হাসিনার সরকার মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, ধর্মান্ধ গোষ্ঠী, জামায়াত-শিবির, রাজাকার, আলবদর-আল সামশদের থেকে একটু যেন দূরত্ব রাখতে চাচ্ছে। সরকার কেন করছে জানিনা। তবে এটা ভয়বহ। সরকারের নিরবতা আমাদের জন্য উদ্বেগের।

ভাস্কর অখিল পাল ব্রেকিংনিউজকে বলেছেন, ভাস্কর্য নিয়ে যে অবস্থাটার সৃষ্টি হয়েছে তা অজুহাত মাত্র। বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশে ভাস্কর্য রয়েছে। মসজিদের সামনেও ভাস্কর্য আছে। সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে যখন থেমিসের ভাস্কর্যটা উঠানো হলো তখন গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে বিভিন্ন দেশের মসজিদের সামনের ভাস্কর্য সামনে আসে। ওই সকল দেশগুলোতে কখনই ভাস্কর্যের বিরোধিতা কেউ করেনি। বাংলাদেশের নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার, নিজস্ব সংস্কৃতি, নিজস্ব ধারা ও নিজস্ব স্ট্যাইল রয়েছে। ভাস্কর্য যদি বন্ধ হতে থাকে তাহলে একটা সময় এই দেশে শিল্প-সাহিত্য থাকবে না। সরকারের উচিত ভাস্কর্য নিয়ে যারা বিরোধিতা করছে তাদের আইনের আওয়াত নিয়ে আসা। যাতে করে স্কাল্পচার (ভাস্কর্য) বানানো নিয়ে ভবিষ্যতে কেউ বাধা-বিঘ্ন কিংবা বিরোধিতা না করে।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ভাস্কর্যের বিরোধিতার কারণে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভাস্কর্যের কাজ পেয়েও করতে পারিনি। এই অপশক্তির সুরহা হওয়া দরকার। সরকারের উচিত জোরালো পদক্ষেপ নেয়া। এতে করে দেশের শিল্পীগোষ্ঠীরা বেঁচে থাকতে পারবেন।

নতুন দায়িত্ব নেওয়া ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান ব্রেকিংনিউজকে বলেছেন, ‘মূর্তি ও ভাস্কর্য এক নয়। একইসঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানের আশাবাদও জানিয়েছেন তিনি। বলেন, কিছু লোক কিছু সময় শুধু বাংলাদেশে না সারা বিশ্বের দরবারে কিছু অঘটন ঘটায়, যখন কোনও সমস্যার দৃষ্টি হয় তখন তা সমাধান করারও ব্যবস্থা হয়।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, আমি এ বিষয়গুলো চিন্তা করব, ভাববো ও পরামর্শ করবো- কীভাবে এটা করলে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। সার্বিক দিক থেকে এসব আর যেন পরবর্তীতে কেউ না করতে পারে, করার সুযোগ না পায়। সেগুলো আমাদের চিন্তায় রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অবশ্যই আমি চেষ্টা করবো। সবার কাছে আন্তরিক সহযোগিতা চাই।

সূত্র : ব্রেকিংনিউজ

সংবাদটি শেয়ার করুন »

আপনার মন্তব্য লিখুন

মুক্তকথা : আরো পড়ুন