মাজিদ মাজিদি: মানবিক চলচ্চিত্র নির্মাতা : ড. আফরোজা পারভীন

সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিতঃ ডিসেম্বর ৪, ২০২০ , ৯:৩৫ অপরাহ্ন

মাজিদ মাজিদি (ফার্সি: مجید مجیدی‎‎) (১৭ই এপ্রিল, ১৯৫৯-) প্রখ্যাত ইরানী চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা এবং চিত্রনাট্যকার। তিনি ইরানের রাজধানী তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন। মাজিদি সবচেয়ে বেশি পরিচিতি লাভ করেন অস্কার মনোনয়নপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র বাচেহা-ই-আসমান (চিলড্রেন অফ হেভেন) এর জন্য। তিনি মূলত শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।

মাজিদের জন্ম ইরানী মধ্যবিত্ত পরিবারে। তেহরানে বেড়ে ওঠা মাজিদ ১৪ বছর বয়স থেকেই অপেশাদার নাট্যদলের সাথে কাজ করতেন । পরবর্তীতে তেহরানের ইনস্টিটিউট অব ড্রামাটিক আর্টস থেকে তিনি নাট্যকলার উপর শিক্ষা গ্রহণ করেন।

১৯৭৯ সালে ইরানী বিপ্লবের পর চলচ্চিত্রের দিকে আগ্রহী মাজিদ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয় করা শুরু করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৯৮৫ সালে মুক্তি পাওয়া মোহসেন মাখ্মলবফের ‘বয়কট’।

২০০৪ সাল পর্যন্ত মাজিদ ছিলেন একাডেমী পুরস্কার এর জন্য মনোনীত একমাত্র ইরানী চলচ্চিত্রকার। ১৯৯৮ সালে নির্মিত বাচেহা-ই-আসমান চলচ্চিত্রটির জন্য তিনি সেরা বিদেশী ভাষায় নির্মিত ছবির জন্য একাডেমী পুরস্কার এর মনোনয়ন পান। কিন্তু রবার্তো বেনিনির লাইফ ইজ বিউটিফুল সে বছর এই পুরস্কারটি পায় । মাজিদি নির্মিত চলচ্চিত্রসমূহ: চিলড্রেন অব হেভেন (১৯৯৮), দ্য কালার অব প্যারাডাইজ (১৯৯৯), মুহাম্মাদ, দ্য ম্যাসেঞ্জার অব গড (২০১৫) ইত্যাদি।

পুরস্কার ও সম্মাননা: মাজিদ মাজিদি প্রচুর পুরস্কার এবং সম্মাননা লাভ করেছেন। তার মধ্যে উল্লে যোগ্য কয়েকটি হলো: ঙবপঁসবহরপধষ ঝঢ়বপরধষ অধিৎফ, ২৫তম মনট্রিল চলচ্চিত্র উৎসব, ২০০১, এৎধহফ চৎরী উবং অসবৎরয়ঁবং, ২৫তম মনট্রিল চলচ্চিত্র উৎসব, ২০০১, সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে একাডেমি পুরস্কার মনোনয়ন প্রাপ্তি, ১৯৯৯, এৎধহফ চৎরী ড়ভ অসবৎরপধং ইবংঃ ঋরষস, ২১তম মনট্রিল চলচ্চিত্র উৎসব, ১৯৯৯

চিলড্রেন অব হেভেন মাজিদির বিখ্যাত চলচ্চিত্র । চলচ্চিত্রটির কাহিনি তিনি লিখেছেন, পরিচালকও তিনি। এ চলচ্চিত্রটি তাঁর জন্য বিশ্বব্যাপী খ্যাতি বয়ে আনে।

ছেঁড়াখোঁড়া এক জোড়া জুতার গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘চিলড্রেন অব হেভেন।’ ইরানের রাজধানী তেহরানের শহরতলির দরিদ্রপাড়ায় পরিবারের সঙ্গে থাকত ছোট্ট আলী। একদিন ছোট বোন জোহরার ছেঁড়া জুতা সারাতে বাজারে যায় আলী। কিন্তু ঘটনাক্রমে জুতোজোড়া হারিয়ে ফেলে আলী। তন্নতন্ন করে খুঁজেও সেটির খোঁজ মেলে না। আলী জুতাটি বাজারে মুচির কাছে রেখে একটি দোকানে আলু কিনতে যায়। তখনই ঘটে বিপত্তি । এক বৃদ্ধ অন্ধ ভিক্ষুক আলীর জুতা নিয়ে চলে যায়। জুতা হারিয়ে আলী মহা বিপদে পড়ে যায় । কারণ বোন জারার এক জোড়াই জুতা। আর এ জুতা পরে সে স্কুলে যায়।

আলীদের সংসার অর্থ কষ্টে জর্জরিত। প্রায় ৫ মাসের বাসা ভাড়া বাকী পড়ে আছে। এছাড়াও মুদি দোকানের বাকী টাকাও দেওয়া হচ্ছে না কয়েকমাস ধরে । আলীর বাবা স্বল্প আয়ের কর্মচারি । অস্স্থু আলীর মা সারাদিন বিছানায় পড়ে থাকে। বাবা-মায়ের বকুনির ভয়ে বাড়িতে কিছু বলে না আলী। তবে জুতার মালিক মানে জারাকে তো বলতেই হয়। জুতো হারানোর কথা শুনে শোকে-দুঃখে কাঁদতে শুরু করে জোহরা। এখন স্কুলে যাবে সে কীভাবে? জারা তখনই বাবা-মাকে ঘটনা বলতে ছুটে যায়! অনেক অনুনয় আর নতুন জুতো দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে ঠেকায় আলী। সেই সঙ্গে স্কুলের জন্য নিজের জুতোজোড়া জারাকে ধার দিতে রাজি হয় আলী। বাধ্য হয়ে মেনে নেয় জারা। জারা কথা দেয় যে সে জুতা হারানোর কথা কাউকে বলবে না। অভাবের সংসারে দিন কেটে যায়। আলীর বিশাল সাইজের ছেঁড়া একজোড়া সাদা জুতো আছে যা জারার পায়ে কোন ভাবেই ফিট হয় না । অন্যকোন উপায় না পেয়ে জারা সেই জুতা জোড়া পরতে রাজি হয়। কারণ সে আলীকে কথা দিয়েছে কাউকে কিছু বলবে না এবং কয়েকদিন পরেই জারা একজোড়া গোলাপী রংয়ের নতুন জুতা পেতে যাচ্ছে এই আশায় ।

শুরু হয় একই জুতা পরে দুই ভাই- বোনের স্কুলে যাওয়া এবং আসার যুদ্ধ। প্রতিদিন সকালে জারা সেই জুতো পরে স্কুলে যায়। স্কুল ছুটির পর জারার বন্ধুরা যখন স্কুলের মাঠে খেলাধুলায় মেতে উঠে জারা তখন তার ভাই আলীর কথা ভেবে এক দৌড়ে ছুটে আসে বাড়ি। কারণ আলী তার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে । জারা তার পা থেকে সেই ছেঁড়া বিশাল সাইজের নোংরা জুতোটি যখন খুলে আলীকে দেয় আলী সেটি পরে দেয় এক দৌড়। কারণ আলীর ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। স্কুলে আসা যাওয়ার এই দৌড়াদৌড়িতে আলী প্রায় প্রতিদিনই স্কুলে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যায় আলীর। ক্লাসের ভালো ছাত্র হওয়ায় প্রথম প্রথম মাফ পেলেও, একদিন তার বাড়িতে জানানোর হুমকি দেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। কিন্তু সামনে আর কোনো উপায় খোলা নেই আলী আর জারার!

একদিন স্কুলে এক দৌড় প্রতিযোগিতার ঘোষণা দেওয়া হয়। তাতে তৃতীয় হলে পুরস্কার হিসেবে পাওয়া যাবে এক জোড়া নতুন জুতা। সুযোগটা কাজে লাগাতে চাইল আলী। পুরস্কারটা পেলেই সব সমস্যার সমাধান। তৃতীয় পুরস্কার পাওয়ার জন্য একদল ছেলের সঙ্গে মরিয়া হয়ে দৌড়াতে শুরু করে সে। কিন্তু দৌড় শেষে ভীষণ এক অবুঝ কান্নায় ভেঙে পড়ে আলী। কারণ তৃতীয় নয়, প্রথম হয়েছে আলী। এ দৃশ্যে সবাই হতবাক। কিন্তু তারা তো জানে না, সে পুরস্কার হিসেবে শুধু জুতোই চেয়েছে, অন্য কিছু নয়! ছবির শেষ দিকে দেখা যায় আলীর বাবার একটি নতুন সাইকেল, দুজোড়া নতুন জুতো।

সামান্য এক জোড়া জুতার কাহিনি বলতে গিয়ে পরিচালক মাজিদ মাজিদি শুনিয়েছেন, অম্লমধুর শৈশবের পাওয়া না-পাওয়ার গল্প। দরিদ্র ভাইবোনের দুরন্ত কিন্তু মানবিক ভালোবাসার গল্প। পাশাপাশি পুরো ছবিতেই ছড়িয়ে আছে হাসি, কান্না, মজা, রোমাঞ্চ আর টান টান উত্তেজনা। গল্পের জাদুতে মলিন জুতো হয়ে উঠেছে রঙে রঙিন, দেশ-কালের সীমানা পেরিয়ে হয়ে উঠেছে সব মানুষের কাহিনি। ১৯৯৮ সালে ইরানে মুক্তি পায় ছবিটি। পরের বছর মুক্তি পায় যুক্তরাষ্ট্রে। ছবিটিতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন আমির ফারুক হাশেমী, বাহার সিদ্দীক, হাসিমিয়ান। ছবিটি ১৯৯৮ সালে বিদেশী ভাষার ছবি হিসেবে অস্কার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়।

১৯৯৯ সালে মাজিদি নির্মাণ করেন ‘দ্যা কালার অফ প্যারাডাইস’ (রাং-ই-খোদা)। ইরানি ভাষায় এর নামের অর্থ দাঁড়ায় খোদার রঙ।

কালার অফ প্যারাডাইস একটি অন্ধ ছেলের গল্প নিয়ে নির্মিত। সমাজে এ ধরণের অন্ধ-প্রতিবন্ধীদের মানুষ সাধারণত সমীহের চোখে দেখে না। বরং তাচ্ছিল্য করে। ছেলেটির নাম মোহাম্মদ। ছবিটি শুরু হয় অন্ধদের একটি স্কুলের প্রেক্ষাপটে। যেখানে দেখা যায় মোহাম্মদ একজন অন্ধ ছেলে, সে পড়াশোনা করছে। তিন মাসের জন্য স্কুল ছুটি, সবাই নিজের বাড়িতে যায়। সবার অভিভাবক এসে তাদের নিয়ে যায়। অথচ মোহাম্মদের অভিভাবক আসে একদিন দেরি করে। মোহাম্মদের বাবা মোহাম্মদকে একটা ঝামেলাই মনে করে তার সংসারের জন্য। তার দুই মেয়ে এক ছেলে। মোহাম্মদের বাবা এসে স্কুলের হেডমাস্টারকে বলে, সে মোহাম্মদকে নিয়ে যেতে পারবে না। কোনভাবে এই তিনমাস তাকে স্কুলে রাখা যায় কিনা। হেডমাস্টার বলে, তা অসম্ভব। দায়ে পড়ে মোহাম্মদের বাবা তাকে নিয়ে যায় সাথে করে গ্রামের বাড়িতে।

গ্রামটি পাহাড়ি, অতি মনোহর। চারিদিকে ফুলের বাগান। মোহাম্মদ ঘোড়ার পিঠে করে যখন বাড়িতে আসে তখন তার বোনেরা উচ্ছসিত হয়, মোহাম্মদের দাদি অনেক খুশি হয় তাকে দেখে।

মোহাম্মদ গ্রামের অবারিত খোলা মাঠ আর ফুলের বাগান দিয়ে ঘুরে ফিরে বেড়ায় বোনদের সাথে। আর ফুলের পাপড়ি, গাছের ডালে হাতড়ে হাতড়ে কি যেন খুজে ফেরে। অপরদিকে মোহাম্মদের বাবা একটি গ্রামের মেয়ের প্রেমে পড়ে। সে তাকে বিয়ে করতে চায়। সেই পরিবারের কেউ জানে না যে তার একটি অন্ধ ছেলে আছে। তাই মোহাম্মদকে সহ্য হয়না তার বাবার।

একদিন মোহাম্মদের বাবা তাকে এক অন্ধ কার্পেন্টার (কাঠমিস্ত্রী) এর কাছে রেখে আসেন। সেই কাঠমিস্ত্রীর কাছে মোহাম্মদ তার দুঃখ তুলে ধরে। তাকে বলে, “আমি অন্ধ বলে আমাকে কেউ ভালোবাসে না, আমার বাবাও না, আমার দাদিও না, তাই আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। আমি অন্য ছেলেদের মত স্বাভাবিক স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করতে পারি না, আমার পড়াশোনা করতে খুব ইচ্ছা করে।”

কাঁদতে কাঁদতে সে বলে, “আমার টিচার আমাকে বলে, পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে আল্লাহ নাকি অন্ধদের সব থেকে ভালোবাসে। তাহলে কেন আল্লাহ আমার চোখ দিলেন না, তাহলে তো আমি তাকে দেখতে পেতাম”। টিচার বলে, “আল্লাহ সর্বদা সবখানে বিদ্যমান, তাঁকে কেউ দেখতে পায় না, তাকে খুঁজে নিতে হয়”।

চলচ্চিত্রের এই মুহূর্তে এসেই বোঝা যায় মোহাম্মদ আসলে গাছে, সাগরের মাটিতে, পাখিদের কলতানে কি খুঁজে ফেরে। সে আল্লাহকে খোঁজে, সে স্বর্র্গের রঙ খুঁজে ফেরে তার হাত দিয়ে।

কাহিনির শেষে মোহাম্মদ মারা যায়। তার বাবা তাকে কোলে নিয়ে কাঁদতে থাকেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তে দেখা যায় মোহাম্মদের হাত নড়ে ওঠে। সে যেন হাত দিয়ে স্বর্গের রঙ ধরার চেষ্টা করে। এই সিম্বলিক সটটির মাধ্যমে মাজিদ মাজিদি এটুকু বোঝাতে চেয়েছেন, মোহাম্মদ বেহেশতের দ্বারে প্রবেশ করছে।

মানুষের আবেগকে এত সুন্দর ভাবে প্রকাশ করার ভঙ্গি সত্যি অসাধারণ,অনবদ্য । চলচ্চিত্রটির মেসেজ অতি সুন্দর ও সাবলীল।

মাজিদ মাজিদি ২০১৫ সালে ‘মুহাম্মদ:দ্য মেসেঞ্জার অফ গড’, নির্মাণ করেন। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স:) এর জীবনীভিত্তিক সিনেমা ‘মুহাম্মদ:দ্য মেসেঞ্জার অফ গড’। এটিকে ইরানের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ছবি হিসেবে অভিহিত করা হয়। ইসলামী বিধি বিধান অনুযায়ী মহানবীর শারীরিক চিত্রায়ন নিষিদ্ধ। সেই নিয়ম মেনেই এই ছবিতে মুহাম্মদ (স:)-এর মুখ দেখাননি মাজিদি। তবুও ছবিটি নির্মাণের শুরু থেকেই বিতর্কের মুখে ছিলেন এই পরিচালক। ছবিটি মুক্তি দিতে গিয়েও বিরোধিতার শিকার হয়েছেন বারবার। বিশেষ করে মুসলিমপ্রধান দেশগুলো এই ছবিটিকে এড়িয়ে চলেছে বরাবরই। বলা হয়েছে এই ছবি ধর্মীয় অস্থিরতা তৈরি করতে পারে যার জন্য দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।

তবে সব বাধা কাটিয়ে ইরানের চলচ্চিত্র ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই ছবিটি অবশেষে মুক্তি পেয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ছেলেবেলার সময়টুকুকে অবলম্বন করে নির্মিত এই ছবি ইরানে দর্শকদের বিপুল প্রশংসা লাভ করেছে। ছবিটির দৈর্ঘ্য ১৭১ মিনিট। এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় চার কোটি মার্কিন ডলার। ছবিটি আংশিকভাবে অর্থায়ন করেছে দেশটির সরকার। ছবিটি নির্মাণে সময় লেগেছে সাত বছরেরও বেশি।মাজিদ মাজিদি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ছবিটি হতে যাচ্ছে একটি ট্রিলোজির প্রথম পর্ব। এর মাধ্যমে ইসলামের প্রকৃত ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে চান তিনি। উগ্রবাদীদের আচরণে যা বিপর্যয়ের সম্মুখীন। এই কাহিনীর ধারাবাহিকতা ধরে রেখে আরো দুটি ছবি ছবি নির্মাণ করতে চান তিনি।

প্রায় দেড় হাজার বছর আগের সৌদি আরবের চিত্র বেশ দক্ষভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে চলচ্চিত্রটিত। ছবির চিত্রায়ণ ছিল অনেকটাই বিষয়ানুগ। মহানবীর (সা.) অভূতপূর্ব জন্ম এবং কৈশোরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময়টুকু এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে দক্ষ নির্মাণশৈলীর মাধ্যমে।

একটি দৃশ্যে দেখানো হয়, উপজাতীয়দের একটি সশস্ত্র দল পবিত্র মক্কা নগরীর দিকে ধেয়ে আসার পথে একঝাঁক কাকের ছুড়ে মারা পাথরেই ধ্বংস হয়ে যায়। এই দৃশ্যের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল তীব্র আবহসঙ্গীত। আরেকটি হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যে দেখা যায়, বালক মুহাম্মদ (সা.)-এর হাতের অলৌকিক স্পর্শে তাঁর ধাত্রী সুস্থ হয়ে ওঠেন। পুরো ছবিতে মহানবীর মহিমা এভাবেই বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে চিত্রায়ন করা হয়েছে।

মুভিতে প্রায় দেড় হাজার বছর আগের আরবের চিত্র বেশ দক্ষভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এতই ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বিরতিহীনভাবে চলা প্র্রয় তিন ঘণ্টার মুভিটি শেষ হয়ে গেলেও মনে হয় না শেষ হয়েছে। মুভিটির ঘটনাপ্রবাহ হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও তাঁর চরিত্রে অভিনয়কারী শিশুটির মুখমন্ডল দেখানো হয়নি। এমনকি যে শিশুটি মুহাম্মদ (সা.) এর চরিত্রে অভিনয় করেছে তার নামও দেখানো হয়নি। ফলে এতদিন যেসব অপপ্রচার চলছিল তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। তবে, মুভিতে আবদুল মোত্তালিব, আবু তালিব, রাসূলের মা আমিনা, দুধমাতা হালিমা, আবু সুফিয়ান, আবু লাহাবসহ তৎকালীন নেতৃবৃন্দের চরিত্রে অভিনয়কারীদের দেখানো হয়েছে।

মুহাম্মাদ (সা) এর জীবনীভিত্তিক ট্রিলজি’র প্রথম পর্বে রাসূলের জন্ম-পূর্ববর্তী কিছু ঘটনা ছিল ফ্ল্যাশ-ব্যাকে। ছবির শুরুটা হয়- শোয়াবে আবু তালিব উপত্যকায় মুসলমানদের অবরুদ্ধ জীবনের দুঃখ-কষ্টের চিত্র তুলে ধরার মাধ্যমে। কুরাইশদের নির্যাতনমূলক চুক্তির ফলে মুসলমানরা নিদারুণ কষ্টে জীবনযাপন করে আবু তালিব উপত্যকায়। সে সময় বিবি খাদিজা বিভিন্নভাবে মুসলমানদের সহযোগিতা করেছেন। তবে মুভিতে হযরত খাদিজাকে দেখানো হয়নি।

শোয়াবে আবু তালিবের ঘটনাপ্রবাহ ২০ মিনিট দেখানো হলেও রাসূল (সা.) কে একবারও দেখানো হয়নি। এক পর্যায়ে সূরা ফিলে বর্ণিত ঘটনা প্রবাহ দেখানো হয়। ইয়েমেনি বাদশাহ আবরাহার হস্তিবাহিনী নিয়ে মক্কায় আক্রমণ ও আবাবিল পাখির মাধ্যমে মহান আল্লাহর প্রতিরোধ চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আবরাহা’র পতনের প্রায় দুইমাস পর রাসূলে খোদার জন্ম হয়। জন্মের সময়কার কিছু অলৌকিক ঘটনা, মুহাম্মদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের চক্রান্ত, তখনকার আরবে নারী শিশুকে জীবন্ত হত্যা, শিশুদের বলিদানের বিরুদ্ধে শিশু মুহাম্মদের অবস্থান, দাসপ্রথা, দাস মুক্তির বিষয়ে (মুহাম্মদ সা.)-এর ভূমিকা, দুধমাতা হালিমার কাছে শিশু মুহাম্মদকে হস্তান্তর, আবার মা আমিনার কাছে ফিরে আসা, আমিনার মৃত্যু, পাদ্রী বুহাইরার সঙ্গে রাসূলে খোদার সাক্ষাৎ, আবদুল মোত্তালিবের মৃত্যু এবং রাসূলের শৈশবের কিছু মুজিজা তুলে ধরা হয়েছে। মুভির শেষাংশে আবারো শোয়াবে আবু তালিবের ঘটনা দেখানো হয়েছে। যেখানে দেখা যায়, মক্কার কুরাইশরা বনু হাশিম গোত্রের সঙ্গে যে নির্যাতনমূলক চুক্তি করেছিল সেই চুক্তির দলিল পোকায় খেয়ে ফেলে। ফলে চুক্তি বাতিল হয়ে যায় এবং নির্বাসিত মুসলমানরা মুক্তি পায়। মুভিটি শেষ হয়েছে একটি নাত-এ রাসূল দিয়ে।

ইসলামী ইরানে এর আগেও বিভিন্ন নবী-রাসূলগণের জীবনীর ওপর চলচ্চিত্র ও সিরিয়াল নির্মাণ করেছে। যেমন: হযরত ইউসুফ (আ.), হযরত মারিয়াম (আ.), হযরত সুলাইমান (আ.), হযরত ইব্রাহীম (আ.), হযরত আইয়ুব (আ.) প্রভৃতি। কিন্তু মুহাম্মাদ (সা.) চলচ্চিত্রটির মতো এত চমৎকার ছবি ইরান কেন, গোটা মুসলিম বিশ্বে আর হয়নি। এই মুভির মাধ্যমে মাজিদ মাজিদি পাশ্চাত্যে রাসূল (সা) এর অবমাননাকর ছায়াছবি ‘ফিতনা’, ‘ইনসেন্স অব মুসলিমস’ ও ডেনিশ কার্টুনের উপযুক্ত জবাব দিয়েছেন। ইসলাম যে সন্ত্রাসী ধর্ম নয়, তা রাসূলের চারিত্রমাধুর্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে এখন পর্যন্ত হযরত ঈসা (আ.) কে নিয়ে প্রায় ২৫০টি ফিল্ম, হযরত মুসা (আ.) কে নিয়ে প্রায় ১২০টি ফিল্ম এবং অন্যান্য নবী রাসূলদের নিয়ে প্রায় ৮০টি ফিল্ম এবং গৌতম বুদ্ধকে নিয়ে প্রায় ৪০টির মতো ফিল্ম নির্মিত হয়েছে; অথচ সেখানে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল মুহাম্মাদ (সা.) কে নিয়ে চলচ্চিত্রের সংখ্যা মাত্র দুটো! চলচ্চিত্রের মতো শক্তিশালী এ মাধ্যম আরো বেশি করে ব্যবহার করা উচিত রাসূলের মহিমা প্রচারের জন্য।
মোহাম্মদ মেহদি হেইদারিয়ান প্রযোজিত এই ছবির দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে ইরান ও দক্ষিণ আফ্রিকার শহর বেলা-বেলাতে।

বিশাল বাজেটের এই ছবিতে কাজ করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কারিগরি বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা। সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন তিনবার অস্কার জেতা ইতালির ভিত্তোরিও স্তোরেরো, এডিটিং করেছেন ইতালির রবার্টো পেরপিগনানি, স্পেশাল ইফেক্টের কাজ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের স্কট ই অ্যান্ডারসন, মেকআপ করেছেন ইতালির গিয়ানেত্তো ডি রসি এবং সংগীত সংযোজনে কাজ করেছেন ভারতের অস্কারজয়ী সংগীত পরিচালক এ আর রহমান।

মাজিদ মাজিদি ব্যতিক্রমী পরিচালক। তাঁর চলচ্চিত্র মানুষের কথা বলে মানবিকতার কথা বলে , ব্রাত্যজজনের কথা বলে। সর্বমানবের কল্যাণার্থে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তিনি। সে কারণে তাঁর প্রতিটি কাহিনি, প্রতিটি নির্মাণ হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
——————————-

ড. আফরোজা পারভীন
কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক, কলামলেখক
অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

সংবাদটি শেয়ার করুন »

আপনার মন্তব্য লিখুন

সাহিত্য : আরো পড়ুন