চাই সামাজিক ঘৃণা ও প্রতিবাদ

সম্পাদকের কলম ডেস্ক
প্রকাশিতঃ নভেম্বর ৮, ২০২০ , ১২:২৬ অপরাহ্ন

এম এ কবীর : হাতে পানির বোতল। তৃষ্ণা লাগলে পানি খাচ্ছেন। শেষে বোতলটা রাস্তায় ফেলে দিচ্ছেন। আপনার সন্তান গাড়িতে বসে চিপস খাচ্ছে। গাড়ির গ্লাস খুলে রাস্তায় চিপসের প্যাকেট ছুঁড়ে দিচ্ছে। আপনি দেখলেন, কখনো বলেননি, এটা করা যাবে না। আপনি নিজেই সন্তানের কাছ থেকে চিপসের খালি প্যাকেট নিয়ে সেই একই কাজ করছেন।

ঘরের ময়লা আবর্জনা সুন্দর প্যাকেট করে এনে ডাস্টবিনে না ফেলে তার পাশে রাস্তার উপরে ফেলে দিচ্ছেন। কেউ কেউ ড্রেনে ফেলেন। হয়তো মনে করেন ড্রেন ¯্রােতস্বিনী নদীর মত। ময়লাগুলো ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।

এই আপনি যখন সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন, তখন সেখানকার রাস্তা দেখে অবাক হন। এত পরিষ্কার, সামান্য ময়লা পাওয়া যায় না। আফসোস করে বলেন, বাংলাদেশ কেন এমন হয় না?

আফসোস করার কিছু নেই। আপনি নিজেকে যদি পরিবর্তন না করেন, রাস্তার পরিবর্তন কি আসমান থেকে হবে?

আপনি যতদিন সিঙ্গাপুর থাকবেন, কখনোই সেই রাস্তায় একটা বাদামের খোসাও ফেলবেন না। সেখানে আপনার আমূল পরিবর্তন। তাহলে সেই পরিবর্তন নিজের দেশে দেখান। দেশের রাস্তাও দেখতে তখন সেখানকার মত ভালো লাগবে।

কিশোর গ্যাং এর স্মার্ট ডিভাইস বা ক্ষিপ্র সাজ-সজ্জা বর্তমানে বহুল আলোচিত বিষয়। তারা স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহারে খুবই পটু। নানা ফন্দি-ফিকির ও কৌশল ব্যবহার করে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার চোখে ধুলো দিয়ে ভয়ংকর অপরাধ ঘটিয়ে চলেছে।

‘মাস্তান’ আমাদের দেশে একটি পরিচিত নেতিবাচক শব্দ। কেমন করে যেন এই শব্দের সাথে অল্পবয়সীদের গ্যাং বা ঘৃণিতদল শব্দটি যুক্ত হয়ে আরো ভয়ংকর নেতিবাচক হিসেবে সমাজে পরিচিতি পেয়ে গেছে। সিনেমা, উপন্যাসেও এসব মাস্তানদের চরিত্র তুলে ধরা হয়। যারা ছোটকালে নির্যাতিত হতে হতে একসময় বড় হয়ে ক্ষমতা অর্জন করে। ক্ষমতাধরদের জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদ করে। নিজের শক্ত পেশী উচিয়ে নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের পক্ষে দাঁড়ায়, উপকার করে। দর্শকদের হাততালি পায়। বাস্তব সমাজে তারা ভিন্ন রূপে বিরাজ করে। এখানে তারা চরম স্বার্থপর। নিজেরা লুটেরাদের ভূমিকায় থেকে বাচ্চা মাস্তানদের জন্ম দেয়। পাহাড়-বন-নদী দখল, বিধবা, অসহায়দের সম্পত্তি দখল, সরকারি খাস জমি দখল, অবৈধ মাদক, জুয়া, চুরি, দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, হত্যা ইত্যাদি নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে ডজন ডজন মামলার আসামী হয়। জনসম্মুখে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

এদের ছত্রছায়ায় নানা বাহিনী, গ্রুপ, গং, গ্যাং জন্ম নিয়ে জালের মত অপরাধকর্মে নিয়োজিত থেকে সমাজে চরম অশান্তি তৈরি করে। বখে যাওয়া-ছন্নছাড়া বিত্তশালী,ঘরপালানো ছেলেরা ছাড়াও দরিদ্র, ভাসমান, এতিম, অভাবী শিশু-কিশোরদেরকে কু-পথে প্ররোচিত করে অপরাধে নিয়োজিত করে।

কিশোর মাস্তানরা দলবল নিয়ে চুরি-ডাকাতি, খুন-লুট করে। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাইবার অপরাধ করে। ব্যাংক জালিয়াতি,তথ্য বিকৃতি, চরিত্র হনন, গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্য চুরির কাজেও তারা পটু। কিশোর মাস্তানরা শক্তিধর মাস্টারমাইন্ডের পরিচালনায় কাজ করে। সেটা শুধু তাদের দলপতিকে জানানো হয়। দলের কর্মীবাহিনী ফুট-ফরমায়েশ করতে করতে এক সময় পয়সা নিয়ে ভয়ংকর সব হুকুম পালন করে।

দেশে অনলাইন শিক্ষার নামে কোটি কোটি শিশু-কিশোরদের হাতে এই অন্ধকার জগতে বিচরণের অবাধ সুযোগ তৈরি হয়েছে। তারা সারাক্ষণ স্মার্ট ডিভাইস হাতে নিয়ে চলে। একদিকে নির্ঘুম রাত অন্যদিকে ঘরবন্দী ব্যায়ামহীন জীবন। হতাশা দৈহিক, মানসিক ক্ষতি করে ফেলছে।

ক্রমাগত একঘেঁয়েমি থেকে বেশি আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে তারা। দেশে অফিস, বাজার, সিনেমা, গণপরিবহন সবকিছু খোলা- শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখাটা যেন বিশেষ বিষে নীল হয়ে আগামী প্রজন্মকে ধ্বংস করার হাতছানি দিচ্ছে।

মোটর বাইক। চাঁদাবাজি করা, ভীতি ছড়ানো এবং দুর্ঘটনা ঘটানো যেন এই বাহনটির প্রধান কাজ। লাইসেন্সবিহীন বাইক নিয়ে কিশোর মাস্তানরা শক্তিধর মাস্টারমাইন্ডের নির্দেশনায় অপারেশনে যায়। বিত্তশালী ঘরের সন্তান হবার কারণে এরা লাইসেন্সবিহীন বাইক নিয়ে ধরা পড়েও ছাড়া পায়।

একদিকে পারিবারিক অবহেলা অন্যদিকে সামাজিক প্রতিবাদহীনতা, প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব সর্বোপরি রাজনৈতিক কমিটমেন্টের অভাব ভয়ংকর ভবিষ্যতের দ্বারপ্রান্তে হাজির করে ফেলেছে। কোন সমাজে যদি সামাজিক ঘৃণা ও প্রতিবাদ তৈরি না হয় তাহলে সেটা ভঙ্গুর হতে বাধ্য।

সামাজিক ঘৃণা ও প্রতিবাদ তৈরির চেষ্টাকে মাস্তান দিয়ে ভন্ডুল করে দেয়া হয়। সুতরাং, কিশোর মাস্তানরা শক্তিধর মাস্টারমাইন্ডের পরিচালনায় আরো শক্তি-সাহস নিয়ে সাধারণ মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দেরি করে না।

গণমাধ্যমে এদের বিশেষায়িত নাম কিশোর গ্যাং। এ নামে তারা ব্যথিত নয়। আপত্তিও করছে না। বরং হিরোইজমে গর্বিত। গ্যাং শব্দটি তাদের কাছে পজিটিভ। তাদের নানা নামও রয়েছে। বিগ্বস্, হাংকি-ফাংকি, নাইন স্টার, পাংকু টেন, ডিসকো বয়েজ ইত্যাদি আজব নামের এই গ্যাং শিরোমনিরা যার যার এলাকায় জাঁদরেল হয়ে উঠেছে। তাদের ফেসবুক গ্রুপ থাকে, আলাদা নাম, বিশেষ পোশাকও থাকে। আজব নানা শব্দও উচ্চারিত হয় তাদের মুখে।

কিশোর গ্যাং বলা হলেও এসব গ্রুপে কিশোর বয়স অতিক্রম করেছে এমন সদস্যও রয়েছে। এতে যেমন স্কুল, কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থী রয়েছে, তেমনি রয়েছে অছাত্ররাও। বরগুনার নয়ন বন্ডের গ্যাংও ছিল এই জাতেরই। নিজেরা গ্যাংয়ের নাম ঠিক করে সেটা আবার প্রচার করে। প্রচারে তাদের প্রসারও আসে।

কিশোর গ্যাং কালচার আলোচনায় আসে ২০১৭ সালে রাজধানীর উত্তরায় দুগ্রুপের বিরোধের জেরে স্কুলছাত্র আদনান নিহত হওয়ার পর। তথাকথিত কিশোরদের এ ধরনের কান্ড এখন কেবল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে নয়, দেশের প্রায় সব শহরে দোর্দন্ডপ্রতাপে চলছে। সমাজের ভেতর এরা দাপটের সঙ্গে আরেক সমাজ কায়েম করে চালিয়ে যাচ্ছে সব ধরনের অপকর্ম।

দীর্ঘদিনের প্রচলিত সংস্কৃতি, ভাষা, বিশ^াস, মূল্যবোধ, আচার-আচরণের বিপরীতে সিনেমেটিক শক্ত অবস্থান এই গ্যাংদের। মারামারি, খুনাখুনি, ছিনতাই, চুরি, পাড়া- মহল্লার রাস্তায় মোটরসাইকেল মহড়া, মাদক, ইয়াবা সেবন, মাদকের বেচাকেনা, চাঁদাবাজি, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করায় যত বাহাদুরিতে তাদের শেষ নেই। কোন গ্যাং কোন গ্যাংয়ের চেয়ে এগিয়ে, এ নিয়ে তাদের মধ্যে চলে প্রতিযোগিতাও।

পুলিশের ক্রাইম অ্যানালাইসিস বিভাগের মাস দুয়েক আগের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকাতেই রয়েছে অন্তত ৫০টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ। ছোট-বড় মিলিয়ে বর্তমানে এ সংখ্যা শতকের কাছাকাছি। বিভিন্ন উপজেলা- জেলা শহরে পাড়া বা মহল্লাভিত্তিক গ্যাংও এখন ক্রিয়াশীল। বিরোধের পাশাপাশি অন্তমিল ও সম্মিলনও হয় তাদের। কার বা কাদের মদদে গড়ে উঠছে এ ধরনের গ্যাং? জবাব এককথায় মিলবে না। তবে নমুনা বলছে, বর্তমানে ভার্চুয়াল মিডিয়া সহজলভ্যতায়, তারকাখ্যাতি, হিরোইজম, ক্ষমতা, বয়সের অপরিপক্বতা, অর্থ লোভ, শিক্ষাব্যবস্থার ঝুঁকি এবং পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা তাদের এই বিকারগ্রস্ত পথে আনতে  ভূমিকা রাখছে।

‘কিশোর গ্যাং’ কালচারের উত্থানকে কেউ কেউ ভিন্নভাবেও দেখছেন। তাদের বক্তব্য সব অপরাধ সংঘটনের পেছনেই কিছু ‘ট্রিগার ফ্যাক্টর’ কাজ করে। অপরাধী যে অপরাধ করছে তা সে অপরাধ ভেবেও করতে পারে আবার না ভেবেও করতে পারে। কিশোর গ্যাং নিয়ে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ কিছু প্রাথমিক কাজ করেছে বলে শোনা যায়। তাদের একটি প্রতিবেদনের তথ্যে বলা হয়েছে, গত বছর কিশোর গ্যাংয়ের বিবাদে খুন হয়েছে পাঁচ কিশোর। আর এ বছরের প্রথম আট মাসেই করোনার মধ্যেও খুনের তালিকায় যোগ হয়েছে আরও সাত কিশোর।

বহু কথিত ‘কোমলমতি’ কিশোর শিক্ষার্থীদের হাতে ক্ষুর ও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার, সহপাঠী খুন, মাদকাসক্তি এবং বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী অপরাধী অপতৎপরতা দৃশ্যমান। শুরুতে কেন্দ্রীভূত ছিল স্কুল শিক্ষার্থীদের অংশ বিশেষের মধ্যে এখন এর বিস্তার ঘটেছে অশিক্ষার্থী কিশোর এমনকি বস্তিবাসীর মধ্যেও।

সাধারণ বিচারে এর কারণ হিসেবে বলা হয়, সামাজিক অবক্ষয়ের কথা, মূল্যবোধ ও আদর্শগত অভাবের কথা। সুস্পষ্ট ভাষায় দায়ভার নির্ধারণ করতে চাইলে প্রথম অভিযোগের দ-টা নেমে আসে পরিবারের ওপর। পারিবারিক সুশিক্ষার অভাব, শৈশব থেকে সন্তানদের আদর্শনিষ্ঠ, সৎপথে পরিচালনায় অভিভাবকদের উদাসীনতা একটি প্রধান কারণ।

বিত্তবান, মধ্যবিত্ত পরিবারে অভিভাবকরা ব্যস্ত নিজ নিজ কাজে বা অবসর-বিনোদনে। তারা ভুলে থাকেন সন্তানদের প্রচলিত ভাষায় ‘মানুষ’ করে গড়ে তোলার দায় তাদের কাজ ও কর্তব্যের অংশ। সে দায় পালিত না হলে আদর্শহীন শিশু-কিশোর শিক্ষায়তনে বা বাইরে সঙ্গীদের কু-প্রভাবে পথভ্রষ্ট হয়, নিষিদ্ধ পথের টানে অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ে। ক্রমে তা বাড়তেই থাকে নানা মাত্রায়।

দ্বিতীয় দায়িত্ব শিক্ষায়তনের অভিভাবক তথা শিক্ষকদের, যদিও সেটা সময় বিচারে আংশিক, তবু গুরুত্বপূর্ণ নজরদারির বিচারে। শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষার্থীরা কী করছে সেদিকে লক্ষ্য রাখার দায় অবশ্যই শিক্ষকদের। প্রহার নয়, শাস্তি নয়, সন্তানতুল্য মায়া-মমতা ও দরদ দিয়ে প্রাথমিক পর্যায়েই পথভ্রষ্টদের সঠিকপথে নিয়ে আসার দায়িত্ব শিক্ষকদের।

আইন, নীতিবাক্য, শাস্তি দিয়ে বা শাস্তির ভয় দেখিয়ে কিশোর-তরুণদের বাগে রাখতে চায় সমাজ। এতে কিশোরদের বিপথগামিতা কমে না বরং বাড়ে। মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে বুনো উল্লাসের সঙ্গে হত্যার মতো ঘটনা ঘটাতেও কুণ্ঠাবোধ করেনা এরা।

শিশু অপরাধের ১০টি মামলায় রায়ে ১৪ শিশুকে সংশোধনের শর্তে তাদের অভিভাবকের জিম্মায় দিয়েছেন আদালত। সুনামগঞ্জে ১০ মামলায় ওই ১৪ শিশু অভিযুক্তকে এক বছরের জন্য ৮ শর্তে এই প্রবেশনে দেন আদালত। সুনামগঞ্জ শিশু আদালত, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচার জাকির হোসেন নিজ খাসকামরায় এ আদেশ দেন। শিশু অপরাধের একসঙ্গে ১০ মামলার আদেশ প্রদান দেশে এই প্রথম।

যে আটটি শর্ত দেয়া হয়েছে সেগুলো হচ্ছে-বাবা ও মায়ের আদেশ মেনে চলা। বাবা-মায়ের সেবা যতœ করা। ধর্মীয় অনুশাসন মানা। নিয়মিত ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা। প্রত্যেকে কমপক্ষে ২০টি করে গাছ লাগানো এবং গাছের পরিচর্যা করা। অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করা। মাদক থেকে দূরে থাকা ও ভবিষ্যতে কোনো অপরাধে না জড়ানো।

শিশু অভিযুক্তদের নিজ বাড়িতে অভিভাবকের জিম্মায় থেকে সংশোধনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। পুলিশ বা বিচারক, বিধান বা উপদেশ, আইন বা ধমক, জেল বা বেতের বাড়ি বর্তমান সংকট থেকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে না। সন্তানকে সময় ও সঙ্গ দিতে হবে, তাদের চলাফেরা, সঙ্গী দল, আচরণ, কথাবার্তার দিকে বিশেষভাবে মনোযোগ দিতে হবে। অভিভাবককে অভিভাবকত্বের যথার্থ সমসাময়িক পাঠ নিতে হবে। এ ধরনের যুগান্তকারী রায়গুলোর দিকে দেশের সব আদালত দৃষ্টি দিলে সেটা কিশোরদের জীবন গঠনে সহায়ক হবে।

যতœ বা প্রতিরোধ না করা হলে ক্ষয় বা অবক্ষয় হবেই। এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। এই সত্য কথাটি শরীর, স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে যেমন ঠিক, তেমনই সঠিক প্রকৃতি ও সমাজের ক্ষেত্রেও। উদাহরণ দেয়া যায় দাঁতের। যতœ, পরিচর্যা বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে না তুললে দাঁতের ক্ষয় হবেই। পাহাড়ে বা নদীতেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, যেমন বৃক্ষ রোপণ ইত্যাদি না করা হলে ভূমিক্ষয়, ভাঙন হবেই। সমাজের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

সমাজের সদস্য হিসেবে অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা জরুরি। অন্যকে দোষারোপের আগে আয়নায় নিজের চেহারা দেখা দরকার। শুধুমাত্র শিক্ষা নয়, দরকার নিজেকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা, নিজেকে সৎভাবে গড়ে তোলা। অন্তরে নীচু মানসিকতার পরিবর্তন করে উন্নত মানসিকতা পোষণ করা। বদঅভ্যাস পরিত্যাগ করা দরকার। যার মধ্যে হিংসা, হিং¯্রতা, পরশ্রীকাতরতা, পরচর্চা অন্যতম। অন্যের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিষয়ের পেছনে মাথা ঘামানোর কুঅভ্যাস যতদিন না বদলাবে ততদিন সামাজিক অবক্ষয় রোধ করা অসম্ভব।

একদিন মৃত্যুবরণ করতে হবে, যেকোনো সময় ভয়ানক অসুস্থ্যতা আসতে পারে, তা ভুলে অপরের দুঃসংবাদে উল্লসিত হওয়া,অপরের ভাল সংবাদে দুঃখী হওয়ার চরম নীচু মানসিকতার পরিচয় বহন করতেও অনেকে পিছপা হয় না। এই জাতীয় মনোভাব পোষণকারীর সংখ্যা সমাজে অনেক। অবক্ষয়ের উৎপত্তি সমাজের এই শ্রেণির মানুষদের দ্বারাই প্রথমে সূচিত হয়।

এই মূর্খরা নিজেদের অতি চালাক এবং জ্ঞানী ভাবে। তারা বুদ্ধিমান জ্ঞানী ব্যক্তিদের বোকা ভাবতে শুরু করে। নিজের কুকীর্তিগুলো দাপটের সাথে চালিয়ে যেতে পছন্দ করে। অন্যের ভালোকে মন্দ দ্বারা কালিমা লেপটে বিকৃত সুখ লাভ করে।

মনে রাখা জরুরি, মহান আল্লাহ্ তায়ালা এই জাতীয় ভয়ঙ্কর মানুষদের দীর্ঘ আয়ু দান করেন নিজেকে সংশোধন করতে।  ইতিহাসের সেই ভয়ঙ্কর বাদশা শাদ্দাদের আয়ু দিয়েছিলেন হাজার বছরের। তার জীবনের চরম পরিণতির কথা আমরা সবাই জানি। অপরাধীরা সুস্থভাবে বেঁচে থাকাকে আল্লাহ্ তায়ালার নেয়ামত ও দয়া না ভেবে নিজের শক্তি, দম্ভ, দাপট ও বাহাদুরির সাথে চলতে পছন্দ করে। অন্যায়, জুলুম করে যেতেই থাকে। নিজে একদিন মারা যাবে, এ চিন্তা ভুলে চালবাজির সীমা অতিক্রম করে অপরকে জ্ঞান বিলিয়ে যাওয়া বেশীর ভাগ নির্বোধ মানুষের বদঅভ্যাস। ভালোকে ভালো আর মন্দকে মন্দ বলার বদলে আত্মম্ভরিতা ও কুৎসা সুযোগ দিচ্ছে উশৃঙ্খল, প্রতারক, ভ-দের। তৈরি করছে সামাজিক অবক্ষয়ের কৃষ্ণ বলয়।

সমাজে নারী, শিশু অত্যাচারিত হলে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। প্রতিকারে কেউ এগিয়ে আসে না। বিপদগ্রস্ত মানুষকে নিয়ে হাসি, ঠাট্টা, গাল-গল্প করেই মজা নেয় অধিকাংশ মানুষ। অশালীনতা, রুচিহীনতা, হিংসা ও পরচর্চা যতদিন ব্যক্তির মনে থাকবে, ততদিন সমাজে অবক্ষয় চলবেই।

আয়নায় নিজের চেহারা দেখা আর বাংলার সেই প্রাচীন প্রবাদ বাক্য মনে রাখা। যাতে বলা হয়েছে, ‘আপনি আচরি ধর্ম, পরকে শেখাও’। মন ও মানসিকতার সঠিক যতœ করা হলে আপনি যেমন সুস্থ থাকবেন, সমাজও অবক্ষয় মুক্ত হয়ে সুস্থ থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন »

আপনার মন্তব্য লিখুন

সম্পাদকের কলম : আরো পড়ুন