লাল কার্ডেও হুঁশ হবে না সড়ক কর্তাদের

সম্পাদকের কলম
প্রকাশিতঃ ডিসেম্বর ৬, ২০২১ , ১২:২৫ পূর্বাহ্ন

দেশের সড়কে অনিয়ম বিদ্যমান থাকাতেই দুর্ঘটনারোধ করা যাচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনার ব্যাপারে জনমনে রয়েছে চরম অসন্তোষ। এ নিয়ে গণমাধ্যম কম সোচ্চার নয়। তারপরেও কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি। প্রতি বছর দেশে অসংখ্য মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে। এতে স্বজনরা হারাচ্ছেন প্রিয় মানুষকে। সড়কের অনিয়ম দূর করতে পারলে দুর্ঘটনার রাশ টেনে ধরা সম্ভব বলে মনে করেন সড়ক বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানী ঢাকায় গাড়ির চাপায় শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় কয়েকদিন ধরে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন রত রয়েছে। রামপুরা ব্রিজ এলাকায় তারা এই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এর আগে ধানমন্ডি এলাকায় শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়ক চাই এবং হাফ পাসের দাবিতে আন্দোলন করে। শিক্ষার্থীদের হাফ পাসের দাবি বিআরটিসির পরে বেসরকারি বাস মালিকরাও মেনে নিয়েছে। দেশের যেসব শহরে বাস সার্ভিস রয়েছে সেখানে হাফ পাস কার্যকর হবে। এ ঘোষণা আসার পরেও শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়ক চাই এর দাবিতে অনড় রয়েছে। তারা এরইমধ্যে নিরাপদ সড়ক চাই বাস্তবায়নে ৯ দফা দাবি তুলে ধরেছে। দাবি পুরনোর ব্যাপারে নানা কর্মসূচি পালন করছে।

শনিবার (৪ নভেম্বর) তারা সড়কের অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘লাল কার্ড’ দেখায়। অনিয়ম আছে, এটা অস্বীকার করার কোনো জো নেই। কর্তৃপক্ষের উচিত হবে দ্রুত সড়কের শৃঙ্খলা আনা। সড়কে শৃঙ্খলা এলে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে বলে ধারণা করা যায়। স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা তাদের সহপাঠি বাস চাপায় মৃত্যু হওয়ায় রাজপথে আজ তাদের নিরাপদ সড়ক চাইয়ের দাবিতে আন্দোলন করতে হচ্ছে। এ থেকে কর্তৃপক্ষের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক চাই এর দাবিতে কেনো আন্দোলন করতে হবে! আগেভাগেই তো দেশের সড়কগুলোকে নিরাপদ করে তোলার কাজটি করে আসা উচিত ছিলো। প্রত্যেক বছর সড়ক দুর্ঘটনায় কত মানুষ মারা যাচ্ছে, সে হিসেবে কর্তৃপক্ষের কাছে নেই তা তো নয়। অনেক দিন ধরেই সড়ক দুর্ঘটনায় অনিয়ম বিরাজ করছে।

এতে অসংখ্য প্রাণহানীর ঘটনা ঘটছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, প্রাণহানীরোধে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগটা কি ছিলো, উদ্যোগ কিছু ছিলো না তা কেউ অস্বীকার করবে না। উদ্যোগ ছিলো তবে সেই উদ্যোগ দ্বারা সড়কের অনিয়ম দূর করা যায়নি। ফলে প্রতি বছর কয়েক হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। দেশের সড়ক যে মরণফাঁদ তা সবার মুখে মুখে ফেরে। মরণফাঁদ কিভাবে অপসারণ করা যায়, তা নিয়ে সরকারি কর্তৃপক্ষ কতটা চিন্তা-ভাবনা করেছে আমরা তা জানি না। তবে সাধারণ জ্ঞান থেকে বলা যায়, দেশের সড়কগুলো মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে, এই থেকে মানুষকে বাঁচানোর জোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

বলা হয়, এতে বড় বাধা দেশের বাস মালিক ও বাসের শ্রমিকরা। এই সত্যটি যদি আমরা মেনেও নিই, তাহলে কি এই বাধা অপসারণের চেষ্টায় কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। রবিবার (৫ ডিসেম্বর) রাজধানীর রামপুরা ব্রিজ এলাকায় শিক্ষার্থীরা নানা ব্যঙ্গচিত্র হাতে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িযে যায়। সড়ক অব্যবস্থাপনার নানা অনিয়ম এই ব্যঙ্গচিত্রে উঠে এসেছে।

ব্যঙ্গচিত্রে সড়কে চলমান অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে বলে দাবি করেন শিক্ষার্থীরা। দুপুর ১২টা ১৭ মিনিট থেকে শিক্ষার্থীরা ব্যঙ্গচিত্র নিয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন শুরু করেন।

মানববন্ধনে আসা শিক্ষার্থীদের ব্যঙ্গচিত্রে সরকার ও বাস মালিকদের সমন্বয়হীনতার যে অনিয়ম বিদ্যমান/চলছে তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। একটি ব্যঙ্গচিত্রে দেখা যায়, বাস মালিকরা প্রশাসনের গলায় দড়ি বেঁধে অপর অংশ নিজেদের হাতে রেখেছেন। চিত্রটিতে আরো দেখা যায় একজন ছাত্রী নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্লোগান দিচ্ছেন ‘আমার ভাই মরল কেন? প্রশাসন জবাব চাই’। কিন্তু মালিক পক্ষ প্রশাসনের গলায় দড়ি বেঁধে রাখায় প্রশাসন ওই ছাত্রীর দাবির দিকে মনোযোগ না দিয়ে ঘুমাচ্ছেন। আরেকটি ব্যঙ্গচিত্রে দেখা যায়, সরকার একটি সিংহাসনে বসে আছে আর সরকারের পায়ের নিচে বাস মালিকপক্ষ বসে আছে। পাশ দিয়ে একজন শিক্ষার্থী নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করছেন। কিন্তু একজন পুলিশ সদস্য মালিক ও সরকারের নির্দেশে ওই শিক্ষার্থীদের ওপরে চড়াও হচ্ছেন।

সড়ক অব্যবস্থান অনিয়মের যে ঘটনা ব্যঙ্গচিত্রের ভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে, তা, উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। সড়কে অব্যবস্থাপনা-অনিয়ম নতুন কোনো ঘটনা নয়। বহু পুরনো। রাজধানীর গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দলীয় লোকজন। যখন বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় ছিল, সে সময় দল দুটির দলীয় লোকজন রাজধানীর গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণ ও মালিক ছিল। শুধু রাজধানীতে নয় সারাদেশের বাসের নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে। মোট কথা যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তাদের আশির্বাদ পুষ্টরাই বাস নিয়ন্ত্রণ করেন। তবে মজার ব্যাপার হলো ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ছাড়াও দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক নেতা বাস মালিক হওয়ায় সারাদেশের বাসের নিয়ন্ত্রণ তাদের মুঠোয়। বর্তমান সরকারের আমলেও একই চিত্র। যেমন বর্তমান বাস মালিক সমিতি নিয়ন্ত্রণে আছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি। ফলে সড়কে দুর্ঘটনারোধ করায় বাধা হয়ে আছে এরাই।

সরকার যখন সড়ককে নিরাপদ করে তুলতে চায় তখন এরাই নানাভাবে অন্তরায় সৃষ্টি করে। পাশাপাশি সড়কের অব্যবস্থাপনাও কম দায়ি নয়। এই অব্যবস্থপনার দূর করার লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষের আর দেরি করা ঠিক হবে না।

দৈনিক সরোবর/এমকে

সংবাদটি শেয়ার করুন »

আপনার মন্তব্য লিখুন

সম্পাদকের কলম : আরো পড়ুন