নতুন ধানের প্রভাব নেই বাজারে

রতন বালো
প্রকাশিতঃ নভেম্বর ২৪, ২০২১ , ৮:৪৪ অপরাহ্ন

সারাদেশে এখন নতুন ধান কাটার মৌসুম চলছে। কৃষকের গোলায় উঠতে শুরু করেছে নতুন ধান। তারপরেও বাজারে তার কোন প্রভাব পড়েনি।

মোট কথা,  চালের বাজার এখন সিন্ডিকেটের কব্জায় থাকায় চালের দাম কমবে এমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। চলতি মৌসুমে আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। দুয়ারে কড়া নেড়েছে নবান্ন। এরইমধ্যে কোনো কোনো এলাকায় কৃষকের গোলায় উঠেছে নতুন ধান। এখন নতুন চালের অপেক্ষায় বাজার। তারপরেও বাজারে চালের দাম কমছে না।

ডিজেলের দাম বৃদ্ধির দোহাই দিয়ে ধান পরিবহন ব্যয় বাড়ার অজুহাতে এই মূল্যবৃদ্ধি বলে অনেক ব্যবসায়ী দাবি করেছে। তাদের মতে পরিবহন খরচ বেড়েছে ২৮ শতাংশ। ফলে আপাতত দেশের চালের বাজারে কোনো পরিবর্তন আসবে না বলে তারা মনে করেন।

কৃষকরা কম দামেই ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, বিভিন্ন এলাকা থেকে এমন খবর আসছে।  বর্তমান মৌসুমে গতবারের তুলনায় ৬ লাখ মেট্রিক টন আমন ধান বেশি উৎপন্ন হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। মাঠ ফসলের তথ্যও বলছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। তারপরেও বাজারে কমছে না চালের দাম।

যদিও ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বোরো মৌসুমে সেচ খরচ কিছুটা বেড়েছে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়লেও তারা তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিয়ে শঙ্কায় আছেন। এক্ষত্রে কৃষকের পণ্যের নায্য দাম নিশ্চিত করা না গেলে কৃষক ধান উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। যদিও বাজারের বর্ধিত মূল্য মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে যাচ্ছে। এখনই এই অবস্থার পরিবর্তন না ঘটলে উৎপাদন হ্রাসের দোহাই দিয়ে সিন্ডিকেট আরো বাজারমূল্য বাড়িয়ে দেবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মাসখানেক আগে চালের যে দাম ছিলো এখনও সেই দামেই বিক্রি হচ্ছে। অথচ দেশে নতুন ধানের সমারোহ বইছে। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্য বলছে, এখন খুচরা বাজারে যে দামে চাল বিক্রি হচ্ছে তা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি। অন্যান্য বছর নতুন চাল বাজারে আসার আগে পুরনো মজুদ চাল বিক্রি বাড়িয়ে গুদাম খালি করতে দেখা যেত ব্যবসায়ীদের। এতে দাম কমতো।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন জানিয়েছে, ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধির পর থেকে পরিবহনের মূল্যও বেড়েছে। এ কারণে চলতি আমন মৌসুমে চালের দাম কমছে না। তার পরেও সম্প্রতি বছরগুলোয় দেশের প্রায় ৫৫ লাখ ৮৭ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় এসেছে। এখনো জমিতে সেচ দেওয়ার ক্ষেত্রে অগভীর নলকূপের প্রাধান্য রয়েছে।

ডিজেল চালিত সেচযন্ত্র দিয়েই জমিতে পানি সরবরাহ করা হয়। মোট সেচকৃত এলাকার ৪৭ শতাংশ জমিতে সেচ প্রদানে ব্যবহার করা হচ্ছে বিদ্যুৎ চালিত যন্ত্র। বাকি ৫৩ শতাংশ জমিতে পানি দিতে ব্যবহার করা হয় ডিজেল চালিত সেচযন্ত্র। অর্থাৎ ডিজেলের বাড়তি দামের বোঝা গিয়ে পড়বে অর্ধেকেরও বেশি জমিতে চাষ করা কৃষকদের ওপর।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে উফশী, হাইব্রিড ও স্থানীয় জাত মিলিয়ে আবাদ হয়েছে প্রায় ৪৮ লাখ ৭২ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে। চলতি অর্থবছরে সেটি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সেচের জন্য তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবারও বোরো আবাদ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে শঙ্কা তৈরি করবে। বোরো ধানের আবাদ ছাড়াও সবজি, তেল, ডালজাতীয় খাদ্য ও দানাদার খাদ্যশস্য উৎপাদন করা হবে। এসব খাদ্য পণ্য উৎপাদনেও সেচের ব্যবহার হয়।

চলতি আমন মৌসুমে ধান ও চাল সংগ্রহ সফল করতে ১৫টি নির্দেশনা জারি করেছে সরকার। এই নির্দেশনা দিয়ে গত ৮ নভেম্বর খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে পরিপত্র জারি করা হয়েছে। চলতি আমন মৌসুমে সরকার খোলাবাজার থেকে ২৭ টাকা কেজি দরে তিন লাখ মেট্রিক টন ধান ও ৪০ টাকা কেজি দরে পাঁচ লাখ টন সিদ্ধ চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ৩১ অক্টোবর খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়। গত ৭ নভেম্বর থেকে আমন ধান ও চাল কেনা শুরু হয়েছে। চলবে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

রাজধানীর খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, যেসব চাল বোরো মৌসুমের ধান থেকে আসে সেগুলোর দু- একটির দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে বেশিরভাগ চাল আগের বাড়তি দামই রয়েছে। বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সাধারণ মানের মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৭-৬৫ টাকা কেজি।

বিক্রেতারা বলছেন, কয়েক সপ্তাহ আগে মিনিকেট চাল ৫৬ টাকায়ও পাওয়া যেত। বাজারে সাধারণ মানের নাজিরশাইল চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি। আগেও এই দামই ছিলো। এ ছাড়া আঠাশ চাল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, কাজললতা ৫২ থেকে ৫৪ টাকা, পাইজাম ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, গুটি স্বর্ণা ৪২ থেকে ৪৪ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এসব চালের দাম আমন মৌসুম শুরুর আগেও একই ছিলো।

টিসিবির হিসেবে বর্তমানে মিনিকেট, নাজিরশাইলসহ সরু চালের দাম গত বছরের এই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি রয়েছে। গতকাল সরুচাল বিক্রি হয়েছে ৫৬ থেকে ৬৮ টাকা কেজি। গত বছর এ সময় যা ৫৪ থেকে ৬২ টাকা ছিলো। তবে মোটা চালের দাম গত বছরের এই সময়ের দামেই বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা কেজি।

যাত্রাবাড়ীর চালের আড়ৎ বিসমিল্লাহ রাইস এজেন্সির মালিক মো. মাসুম বলেন, চালের দাম কমতে আরো ১৫ দিন লাগবে। আগে আমরা রাজশাহী, নওগাঁ, কুষ্টিয়া থেকে প্রতি ট্রাকে ১৫ টন করে চাল আনতাম ১৪ হাজার টাকা ভাড়ায়। এখন ১৮ হাজার টাকা লাগছে। সে হিসেবে মিল থেকে আনতে পরিবহন খরচ বেড়েছে ২৮ শতাংশ। কেজিপ্রতি ২৭ পয়সা। ডিজেলের দাম না বাড়লে আমন মৌসুমের এই সময়টাতে চালের দাম ২০-২৫ পয়সা করে কমতো মিল পর্যায়ে। কিন্তু এবার তা হচ্ছে না।

কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের তথ্যনুযায়ী, দেশের ১ কোটি ২৩ লাখ কৃষক ডিজেলচালিত যন্ত্রের মাধ্যমে সেচকাজ পরিচালনা করে থাকেন। এ সংখ্যক কৃষক প্রায় সাড়ে ১২ লাখ ডিজেলচালিত সেচ পাম্প ব্যবহার করে থাকেন। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে উফশী, হাইব্রিড ও স্থানীয় জাত মিলিয়ে আবাদ হয়েছে প্রায় ৪৮ লাখ ৭২ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে। চলতি অর্থবছরে সেটি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু সেচের জন্য তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবারও বোরো আবাদ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে শঙ্কা তৈরি করবে। বোরো ধানের আবাদ ছাড়াও সবজি, তেল, ডালজাতীয় খাদ্য ও দানাদার খাদ্যশস্য উৎপাদন করা হবে। এসব খাদ্য পণ্য উৎপাদনেও সেচের ব্যবহার হয়।

চালের দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে যা করা দরকার এ বিষয়ে সাবেক খাদ্য সচিব আবদুল লতিফ মন্ডল বলেন, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত এবং চালের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে এখন যা করণীয় তা হলো, আমন সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জনে সার্বিক প্রচেষ্টা চালানো।

বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে যতটা সম্ভব চালের সরকারি মজুদ বাড়াতে হবে। সরকার এরইমধ্যে চলতি অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ১০ লাখ টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রয়োজনে সরকারি- বেসরকারি খাতে চাল আমদানি বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকদের উৎসাহ জোগাতে তাদের সার্বিক সহযোগিতা দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, করোনার প্রাদুর্ভাবকালে যখন অন্যসব খাত ধরাশায়ী হয়ে পড়েছে, তখন কৃষি খাত ও কৃষকরাই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন »

আপনার মন্তব্য লিখুন

জাতীয় : আরো পড়ুন