অনানুষ্ঠানিক সেক্টরে পরিণত হচ্ছে ট্যানারী শিল্প

রতন বালো
প্রকাশিতঃ নভেম্বর ২৩, ২০২১ , ১১:০৫ অপরাহ্ন

দীর্ঘ দিনেও ট্যানারী শিল্পে শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এই আইন বাস্তবায়ন না হওয়ায় দুই লাখ পুরুষ ও নারী শ্রমিকরা ন্যায়সংগত অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উন্নয়ন হচ্ছে না। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার মত ট্যানারী শিল্পটি আনুষ্ঠানিক সেক্টর থেকে অনানুষ্ঠানিক সেক্টরে পরিণত হচ্ছে। এই সেক্টর দক্ষ ও অভিজ্ঞ শ্রমিক হারাচ্ছে এবং মানসম্মত চামড়া তৈরির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন ট্যানারী ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সংশ্লিষ্টরা। তারা এ ধরনের বেআইনি প্রক্রিয়া বন্ধ করার দাবি জানান।

এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী রূপকল্প ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত মধ্যম আয়ের দেশ, ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির অভীষ্ট লক্ষ্যসমূহের সফল বাস্তবায়ন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করে সেই অভীষ্ঠ অর্জনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকার অঙ্গীকার করেছেন।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত চামড়া শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকার চামড়া শিল্পকে অন্যতম উচ্চ অগ্রাধিকার শিল্প হিসেবে ঘোষণা করে শিল্পটি ২০১৭ সালে ‘প্রডাক্ট অব দ্য ইয়ার’ স্বীকৃতি দিয়েছে। সে হিসেবে ২০২১ সালের মধ্যেই ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন থেকে এই শিল্প খাতটি এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

এদিকে একটি আধুনিক, উন্নত ও পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্প প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারী স্থানান্তরের সরকারি উদ্যোগকে সবাই স্বাগত জানিয়েছিল। শ্রমিকদের আশা ছিল ট্যানারী স্থানান্তর হলে কিছুটা হলেও তাদের শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু শ্রমিকদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। চামড়া শিল্প নগরীতে শ্রমিকদের থাকার জন্য বাসস্থান, চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল, খাবারের জন্য ক্যান্টিনসহ অন্যান্য ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা না রাখায় প্রতিনিয়ত শ্রমিকরা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।

মঙ্গলবার রাজধানীর তোপখানা রোডের একটি অভিজাত হোটেলে ট্যানারী ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন ও সলিডারিটি সেন্টার (বাংলাদেশ অফিস) যৌথ আয়োজিত ‘ট্যানারী শ্রমিক, শিল্প ও পরিবেশের বিরাজমান সমস্যা: সংকট উত্তরণে করণীয় মিটিং’ বিষয়ক একটি ধারণাপত্রে এসব তথ্যের কথা তুলে ধরা হয়। সলিডারিটি সেন্টার-বাংলাদেশ অফিসের প্রোগ্রাম অফিসার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম এই ধারনাপত্র উপস্থাপন করেন।

প্রস্তাবনা পত্রের ওপর ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক জানান, প্রায় ৭০ বছরের পুরানো ট্যানারী শিল্প প্রথমে নারায়ণগঞ্জে এবং পরে ঢাকার হাজারীবাগে বিকাশ লাভ করে। পরিবেশ ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীকে দূষণের হাত থেকে রক্ষার জন্য ট্যানারী শিল্প ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুরে ‘বিসিক চামড়া শিল্প নগরী’তে স্থানান্তরিত হয়। সেখানে ১৫৪টি ট্যানারি জমি বরাদ্দ পায়, কিন্তু বর্তমানে উৎপাদনে রয়েছে ১৩২টি ট্যানারী।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের পরিবারের পাশাপাশি এই শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত পশুখামারি, কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী, কেমিকেল ব্যবসায়ী, রপ্তানির অযোগ্য চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে স্থানীয় বাজারে সরবরাহকারী, স্প্লিট চামড়া ব্যবসায়ী, লেদার ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড টেকনোলোজিস্টসহ অনেকে জড়িত। দেশের উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী জীবনধারণের জন্য নানাভাবে এই শিল্পের উপর নির্ভরশীল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ট্যানারী ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন সভাপতি আবুল কালাম আজাদের সঞ্চালনায় অন্যান্যের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যুগ্ম মহাপরিদর্শক ডা. মুস্তাফিজুর রহমান, অ্যাফেয়ার্স ব্যুরোর যুগ্ম পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন, সলিডারিটি সেন্টারের-(বাংলাদেশ অফিস) লিগ্যাল কাউন্সেলর এডভোকেট সেলিম আহসান খান প্রমুখ।

‘ট্যানারী ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’ দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে বিগত ৫৭ বছর ধরে ট্যানারী শিল্প সেক্টরের শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করে আসছে বলে জানান ডা. মুস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, ট্যানারী শিল্পের আলোচনা নিয়ে আমি ব্যাথিত। ট্যানারী শ্রম সেক্টরে শ্রম আইন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এই শিল্পটি আজ কোথায় গিয়ে থাকার কথা। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। তিনি ট্যানারী ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের ধারণাপত্রে উল্লেখিত ৯টি সুপারিশের প্রতি তিনি এক মত প্রকাশ করেন।

ট্যানারী ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ট্যানারী শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং পরিবেশ বিষয়ে শ্রমিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ সম্পর্কে শ্রমিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, ট্যানারী ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সক্ষমতা উন্নয়ন, শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যক্যাম্প আয়োজন, কোভিড-১৯ থেকে সুরক্ষার জন্য মাস্ক ও অন্যান্য উপকরণ বিতরণ এবং আইন সহায়তা প্রদান ইত্যাদি বিষয়ে সলিডারিটি সেন্টার ট্যানারী ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সঙ্গে যৌথভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। করোনা মহামারির কারণে প্রত্যাশিত মাত্রায় কার্যক্রম বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।

মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম প্রস্তাবনা ধারনাপত্রে জানান, ট্যানারী শিল্পের বর্জ্যরে কারণে পরিবেশ দূষণের ইস্যুটি বহুল আলোচিত একটি বিষয়। ট্যানারী স্থানান্তরের দীর্ঘ ৫ বছরেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং মানসম্পন্ন কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) তৈরি না করা ও তা পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় পরিবেশ দূষণ অব্যাহত রয়েছে। পরিবেশ দূষণের দায়ে কারখানাগুলো এখনো পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পায়নি। যুগের অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারখানার কর্মপরিবেশ ও কমপ্লায়েন্সের উন্নয়নে মালিক পক্ষের উদ্যোগ ও সরকারের তদারকি প্রত্যাশিত মাত্রায় চোখে পড়ছে না। ফলে পরিবেশ ও কমপ্লায়েন্স ইস্যূতে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের সনদ না পাওয়ায় ইউরোপের বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও বায়ারগণ বাংলাদেশ থেকে চামড়া নেওয়া বন্ধ করে দেওয়ায় বর্তমান চামড়া শিল্প খাতটি ধীরে ধীরে আরো বেশি সংকটের দিকে যাচ্ছে।

সিইটিপি’কে শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যকরভাবে চালু করার উদ্দেশ্যে এবং শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারদের সমস্যা সমাধানে সরকারের একটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ বলে আলোচকরা মনে করেন। আধুনিক চামড়া শিল্প নগরী গড়ে তোলার জন্য সরকারের যে সদিচ্ছা সেটি বাস্তবায়নের জন্য সরকার আরো সমন্বিত পরিকল্পনা, সমন্বিত কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসবে বলে বক্তরা প্রত্যাশা করেন।

দৈনিক সরোবর/এমকে

সংবাদটি শেয়ার করুন »

আপনার মন্তব্য লিখুন

জাতীয় : আরো পড়ুন