গবেষণায় পাওয়া গেলো প্রাক-ইনকা সংস্কৃতির মানুষের রক্তে তৈরি মুখোশ

সরোবর ডেস্ক
প্রকাশিতঃ নভেম্বর ৪, ২০২১ , ৪:১৪ অপরাহ্ন

প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো থেকে হাজারো বছর পূর্বের সভ্যতা-সংস্কৃতি, রীতিনীতি প্রভৃতি সম্পর্কে জানা যায়। এসবের মধ্যমে অনেক রহস্যময় আচার-অনুষ্ঠানের প্রমাণ পাওয়া যায়, যা সবার মধ্যেই কৌতূহল জাগায়।

প্রত্নতত্ত্ববিদরা পেরুর প্রাচীন সিকান সংস্কৃতিতে তেমনই একটি রহস্যময় আচার-অনুষ্ঠানের সন্ধান পেয়েছেন। পেরুর উত্তর উপকূলে প্রায় ৭৫০ থেকে ১৩৭৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে সিকান সংস্কৃতির বিস্তার ছিল। প্রত্নতত্ত্ববিদরা এখানে খনন করে অন্যান্য অসংখ্য নিদর্শনের মধ্যে রহস্যময় মুখোশেরও সন্ধান পেয়েছেন, যা মানুষের রক্ত দিয়ে তৈরি।

পেরুর উত্তর উপকূলে সিকান প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট থেকে প্রত্নতত্ত্ববিদরা ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে একটি সমাধি ও এ সংশ্লিষ্ট অসংখ্য নিদর্শনের সন্ধান পান, যা প্রাক-ইনকা সংস্কৃতির অংশ। প্রাচীন নিদর্শনগুলোর মধ্যে গবেষকরা লাল রঙে সজ্জিত একটি ১ হাজার বছরের পুরোনো সিকান সোনার মুখোশও আবিষ্কার করেছিলেন। এ মুখোশে বিশেষ প্রকৃতির পেইন্ট ছিল। প্রথম দিকে গবেষকরা পেইন্টটি সেই সময়ে সাধারণ প্রাকৃতিক পদার্থ থেকে আঁকা বলে ধারণা করেছিলেন। সেই সময় কারো ধারণা ছিল না যে, এতে মানুষের রক্তও রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা পরিচালনা করে বিশেষজ্ঞরা জানতে পেরেছেন রহস্যময় এ সিকান সোনার মুখোশের পেইন্ট মানুষের রক্ত দিয়ে আঁকা।

সোনার মুখোশটি ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সী একজন ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন কঙ্কালের মাথায় লাগানো ছিল। তিনি ১১ শতকে পেরুর উপকূলীয় অঞ্চল দখলকারী প্রাচীন সিকান সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। মুখোশটিতে পাওয়া লাল রঙটিও লোকটির কঙ্কালের উপরে ছড়িয়ে পড়েছিল, যা সমাধির কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছিল। এ সমাধির ভিতরে আরো চারটি কঙ্কাল পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে সমাধিতে রাখা আরো বেশ কিছু সোনার নিদর্শন ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অন্যান্য সামগ্রী আবিষ্কৃত হয়েছে।

সিকানরা মূলত পেরুর উত্তর উপকূলে আনুমানিক ৮ম শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ১৪ শতক পর্যন্ত সময়ে বসবাস করতো। সিকানরা দক্ষ ও নিবেদিত ধাতু শ্রমিক ছিল। বিশেষ করে ১০ম থেকে ১২ শতক পর্যন্ত তারা বিশুদ্ধ সোনা দিয়ে তৈরি ব্যক্তিগত এবং আনুষ্ঠানিক বস্তুর একটি বিস্ময়কর বৈচিত্র্য তৈরি করেছিল। শাসক ও অভিজাতদের সমাধিতে এই ধরনের বস্তুগুলো সমাধিস্থ করার সাধারণ রীতি প্রচলিত ছিল সেখানে। সম্ভবত দেবতাদের উদ্দেশ্যে বা পরকালে ব্যবহারের জন্য তারা এগুলো সমাধিস্থ করতো।

১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে সিকান প্রত্নতাত্ত্বিক প্রকল্পের প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং সংরক্ষকদের একটি দল ৩৯ ফুট গভীর (১২ মিটার) সমাধি কক্ষ খনন করেছিল যাতে পাঁচটি অক্ষত কঙ্কাল ছিল। সমাধিটি একটি অত্যাশ্চর্য এবং বিস্তৃত সংগ্রহে পূর্ণ ছিল, যার মোট ওজন ছিল প্রায় ১ দশমিক ২ টন বা ১ দশমিক ১ মেট্রিক টন। এগুলোর মধ্যে বেশ কিছু সোনার জিনিস অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ থেকে বোঝায় যে, এটি একটি ধনী এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সমাধি ছিল।

মধ্যবয়সী এ ব্যক্তির কঙ্কাল সমাধির মাঝখানে রাখা হয়েছিল। তাকে একটি উদ্ভট ভঙ্গিতে পাওয়া গেছে। তিনি কোমর বাঁকিয়ে ছিলেন, যেন বসে আছেন কিন্তু উল্টো করে রাখা। তার পাশে মাটিতে তার মুখোশ ঢাকা মাথার খুলি ছিল। এর পাশেই ছিল দুই তরুণীর কঙ্কালের দেহাবশেষ। এ দুই তরুণীর কঙ্কাল এমনভাবে রাখা ছিল যে, দেখে মনে হয়- একজন বাচ্চা জন্মদান করছে এবং অন্যজন ধাত্রীর ভূমিকা পালন করছে। সমাধির একটি উচ্চ স্তরে প্রত্নতত্ত্ববিদরা দুটি শিশুর কঙ্কাল খুঁজে পান। এ কঙ্কাল দুটি অনেকটা কুঁকড়ে যাওয়া অবস্থায় ছিল।

সেখান থেকে প্রাপ্ত নিদর্শনগুলোর মধ্যে মুখোশ ছাড়া অন্য কোনো কঙ্কাল বা শিল্পকর্ম লাল রঙে আঁকা হয়নি। এই সম্মান শুধু অভিজাত মানুষ ও তার সোনার মুখোশের জন্য সংরক্ষিত ছিল। লাল রঙটি সিনাবার থেকে প্রাপ্ত রঙ্গক, এক প্রকার পারদ আকরিক যা থেকে উজ্জ্বল লাল রঙ্গক বের করে অঙ্কন, পেইন্টিং বা লেখার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল বলে গবেষকরা প্রথমে ধারণা করেছিলেন।

তবে এরপরও সিকান সোনার মুখোশে ব্যবহৃত লাল রঙের বিশ্লেষণ চলতে থাকে, যা থেকে আরো রহস্যময় তথ্য জানা যায়। সিকান সমাধির রহস্যময় আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে বিশদ তথ্য উন্মোচনের জন্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের একটি দল প্রত্নতত্ত্ববিদ লুসিয়ানা ডি কোস্টা কারভালহোর নেতৃত্বে গবেষণা শুরু করেন। তারা এর সঠিক উপাদানগুলো প্রকাশের জন্য ভর স্পেকট্রোমেট্রি ব্যবহার করে এই লাল রঙের একটি রাসায়নিক বিশ্লেষণ করেছেন।

এই গবেষণার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল লাল রঙের অবিশ্বাস্য দীর্ঘায়ুর রহস্য উদঘাটন করা। কারণ মুখোশের পেইন্টিং ও কঙ্কাল ১ হাজার বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে সমাধিস্থ অবস্থায় ছিল, তবুও এর রঙ অনেকটাই অক্ষত ছিল। প্রাথমিকভাবে, বিজ্ঞানীরা পেইন্টে পাওয়া পদার্থগুলো শনাক্ত করতে ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি ব্যবহার করেছিলেন। এই পদ্ধতিটি বিভিন্ন প্রোটিনের উপস্থিতি প্রকাশ করে, যার অর্থ পেইন্টটিতে সিনাবার রঙ্গক বা পিগমেন্ট ছাড়াও কিছু জৈব উপাদান ছিল।

একটি ভর স্পেকট্রোমিটারের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করতে সক্ষম হন যে, পেইন্টের বেশিরভাগ প্রোটিন মানুষের রক্ত ​থেকে এসেছে। অন্যান্য প্রোটিন ডিমের সাদা অংশ থেকে এসেছে, সম্ভবত মুসকোভি হাঁস নামে পরিচিত একটি প্রজাতির ডিমের সাদা অংশ, যা প্রাচীনকালে পেরুর ঐ অঞ্চলে পাওয়া যেত।

সমাধিতে পাওয়া কঙ্কালগুলোর বিন্যাসও ছিল অস্বাভাবিক। গবেষকদের ধারণা, এর আচার-অনুষ্ঠানগত তাৎপর্য ছিল। মধ্যবয়সী ব্যক্তিটির শরীর নিচের দিকে অনেকটা উপুড় অবস্থায় ছিল, তবে মাথার খুলির মুখ এবং আবরণের মুখোশ উপরের দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় ছিল। আর তরুণী দুজনের অবস্থান আসন্ন প্রসবের ধারণা দেয়, যা লোকটির আগত পুনর্জন্মের প্রতীক হতে পারে। সম্ভবত মৃত্যুর পরের জগতে পুনর্জন্মের বিশ্বাস থেকে তাদের এভাবে সমাধিস্থ করা হয়েছিল।

সিনাবার পেইন্টের ব্যবহারও একটি ইঙ্গিত ছিল যে, সমাধিস্থ করার বিশেষ কিছু আনুষ্ঠানিক অর্থ ছিল। সিনাবার-ভিত্তিক পেইন্টগুলো সাধারণত সামাজিক অভিজাত এবং আচারগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হতো বলে গবেষকরা মতামত দিয়েছেন। অভিজাত মানুষের কঙ্কালকে ঢেকে রাখা লাল রঙটি হয়তো মানুষের রক্তে পাওয়া প্রাণশক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

এছাড়া সিকান সংস্কৃতিতে মানব বলিদানেরও অন্য রহস্য রয়েছে। সিকানের আচার-অনুষ্ঠানের সাম্প্রতিক আরেকটি গবেষণা থেকে জানা যায়, দেবতাদের কাছ থেকে অনুগ্রহ লাভের উপায় হিসাবে মানব বলির উপর তাদের নির্ভরতা প্রকাশ করেছে। তারা ঘাড়ের ধমনী কেটে বলিদানের একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেছিল যাতে দ্রুত ও পর্যাপ্ত রক্তপাত ঘটে।

তবে সিকান সোনার মুখোশ দিয়ে সমাধিস্থ করা মধ্যবয়সী ব্যক্তিটি মানব বলিদানের শিকার ছিলেন না। তার সঙ্গে সমাধিস্থ করা নারী ও শিশুদের বলি দেওয়া হয়েছিল বলে মনে করেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা। যাতে তারা মৃত্যুর পরের জগতে তার সঙ্গী হতে পারে। এ সঙ্গী তার পরিবারের সদস্য অথবা অন্য কেউ হতে পারতো। সূত্র- অ্যানসিয়েন্ট অরিজিনস।

দৈনিক সরোবর – এমআর

সংবাদটি শেয়ার করুন »

আপনার মন্তব্য লিখুন

সাতরং : আরো পড়ুন